করোনাভাইরাস- আমাদের মনোজগৎ-কামরুল হাসান বাদল লেখক: কবি, সাংবাদিক

পোস্ট করা হয়েছে 06/03/2020-06:22pm:    বিশ্বকবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের ‘তালগাছ’ শিশুতোষ লেখাটি দু বাংলাতেই বহুল পঠিত। ছোটদের উদ্দেশে লেখা হলেও কবিতার মর্মার্থটি অত্যন্ত ব্যাপক, বাস্তব ও পরম সত্যের। তালগাছটি মনের মতো করে আকাশে উড়তে চায় মাটির পৃথিবী ছেড়ে তার পাতাগুলোকে ডানা বানিয়ে। দিনভর আকাশে ঘুরে বেড়ায়। যেন তারাদেরও ছাড়িয়ে যাবে সে। তারপর এক সময় ‘তারপরে হাওয়া যেই থেমে যায়, পাতা কাঁপা থেমে যায় ফেরে তার মনটি
যেই ভাবে মা যে হবে মাটি তার ভালোলাগে আরবার পৃথিবীর কোণটি।
শেষ পর্যন্ত তালগাছকে মাটির পৃথিবীতে ফিরে আসতে হয়, বাস্তবে ফিরে আসতে হয়।
চীনে প্রথমে করোনাভাইরাসে আক্রান্তের খবর শুনে এদেশের কিছু মানুষের মনে তালগাছের মতো যেন ভাবনার উদয় হয়েছিল। তারা ভাইরাসটিকে খোদার গজব হিসেবে ব্যাখ্যা করেছিল এবং গজবের কারণ হিসেবে চীনে বিশেষ করে উইঘুরে মুসলমানদের নির্যাতনের বিষয়টিকে তুলে ধরেছিল। এরপর থেকে শুরু করা হয় নানা ধরনের বিভ্রান্তিকর সংবাদ পরিবেশন। এর মধ্যে চীনের প্রেসিডেন্টকে পর্যন্ত মুসলমান বানিয়ে এবং নামাজ পড়িয়ে ছেড়েছে। টঙ্গির বিশ্ব ইজতেমার ছবি যেখানে রাস্তায় দাঁড়িয়ে মানুষ নামাজ আদায় করছে তেমন ছবি পোস্ট করে বলা হয়েছে চীনের মানুষ দলে দলে ইসলাম ধর্ম গ্রহণ করেছে। ফলে সেখানে করোনাভাইরাসের প্রকোপ কমতে শুরু করেছে। প্রথম থেকেই ফেসবুকে বাঁশের কেল্লা ধরনের অ্যাকাউন্ট থেকে এমন প্রপাগান্ডা ছড়ানো হলো যে মুসলমানদের ওপর অত্যাচারের কারণে চীনে আল্লাহ এমন গজব দিয়েছে। আর চীনারা যখন আল্লাহর কাছে আত্মসমর্পণ করেছে তখন তারা এই গজব থেকে মুক্তি পেয়েছে।
কিন্তু এরপর এই রোগ যখন ইরানেও ছড়িয়ে পড়ল তখন তারা বলতে লাগল ইরান শিয়া মুসলিমদের দেশ ফলে সেই মুসলমানদের ভেজাল আছে। এরপর ভাইরাস দ্রুত ছড়িয়ে পড়ছে দেশ থেকে দেশ, মহাদেশ থেকে মহাদেশে। খুব সহসা মধ্যপ্রাচ্যের দেশগুলো সতর্কতা জারি করলো । সৌদি আরব ওমরাহ ভিসা প্রদান বন্ধ করে দিল এবং কয়েকটি দেশে প্রকাশ্যে জমায়েত এবং জুমার নামাজের ওপরও নিষেধাজ্ঞা আরোপ করে। কথিত সেই ‘গজবে’ যখন মুসলমানরাও আক্রান্ত হওয়া শুরু করল সে সময় তালগাছের মতো মনের মাধুরী মিশিয়ে আকাশে উড়ে বেড়ানো অনেকের মুখ বন্ধ হতে থাকলো। অনুকূল বাতাস না পেয়ে তাদের কেউ কেউ শুষ্ক বদনে মাটির পৃথিবী বা বাস্তবতায় ফিরতে শুরু করল এবং মিনমিন করে তবুও নিজেদের স্বপক্ষে কথা বলার চেষ্টা অব্যাহত রাখল।
অন্যদিকে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ভাইরাসটিকে চীনকে দমন করার, দুর্বল করার অস্ত্র হিসেবে ব্যবহার করার চেষ্টা শুরু করল। চীন বিশ্বের এক নম্বর অর্থনৈতিক পরাশক্তি। সামরিক দিক দিয়ে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র এবং তার ঘনিষ্ঠ মিত্রদের সমন্বিত শক্তির তুলনায় দুর্বল হলেও তার সামরিক শক্তিকে উপেক্ষা করার শক্তিও নেই আমেরিকার। বরং চীনের এই দুর্যোগের ঢেউয়ের আঘাত সুদূর আমেরিকার অর্থনৈতিক ব্যবস্থার ওপর বেশ জোরেই আঘাত হানছে। অভিজ্ঞ মহলের ধারণা চীনে এমন পরিস্থিতি আর মাত্র মাসখানেক চললে বিশ্ব অর্থনৈতিক ব্যবস্থাই ভেঙে পড়বে।
তবে এরচেয়ে বড় আতঙ্কের বিষয় হলো এই ভয়ঙ্কর ভাইরাস প্রতিদিন নতুন নতুন দেশে ছড়িয়ে পড়ছে। মঙ্গলবার পর্যন্ত চীনসহ ৭৫টি দেশ ও অঞ্চলে ছড়িয়ে পড়ার খবর পাওয়া গেছে। বিশ্বের অর্ধেকের বেশি মানুষ এসব দেশ ও অঞ্চলে বাস করে। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা পরিস্থিতিকে দিক নির্দেশনাহীন বলে বর্ণনা করেছে। শ্বাসতন্ত্রের এমন জীবাণু এর আগে বিশ্বে দেখা যায়নি।
সমস্যা হচ্ছে কোনো সাধারণ নিয়মে এই ভাইরাস দেশ থেকে দেশে ছড়াচ্ছে না। প্রতিটি দেশেই সংক্রমণের ধরন আলাদা বলে মনে হচ্ছে। মাত্র ২ মাসের মধ্যে আক্রান্ত হয়েছে প্রায় এক লক্ষ মানুষ। মারা গেছেন তিন হাজারের মতো। বিশ্বময় এই ভাইরাস ছড়িয়ে পড়ার সময় কোন দেশটি মুসলিম কোনটি ইহুদি-নাসারা! ও অমুসলিমদের সে বাছ-বিচার করেনি। এই ভাইরাস এরই মধ্যে সৌদি আরব, জর্ডান, তিউনিসিয়াসহ সাত দেশেও ছড়িয়েছে। ইরানে আক্রান্ত হয়েছে ২৩ এমপি। সিঙ্গাপুরে আক্রান্তদের মধ্যে বাংলাদেশি মুসলমানও আছেন।
২। রোগ-বালাই, মহামারী নতুন কিছু নয়। আধুনিক চিকিৎসাপদ্ধতি আবিষ্কারের আগে বিশ্বে মহামারী ও বিভিন্ন রোগে লাখ লাখ মানুষ মৃত্যুবরণ করেছে। কলেরা, ডায়রিয়া, টাইপয়েড, বসন্ত, প্লেগে আক্রান্ত হয়ে লক্ষ লক্ষ মানুষের মৃত্যু ঘটেছে। গ্রামের পর গ্রাম, জনপদের পর জনপদ মানুষশূন্য হয়েছে এমন মহামারীতে আক্রান্ত হয়ে। এমনকি এই বর্তমান সময় যখন চিকিৎসাবিজ্ঞানে মানুষ অভূতপূর্ব সাফল্য অর্জন করেছে সে সময়ও ম্যাডকাউ, ইবোলা, মার্স, সার্স ইত্যাদির মতো ভাইরাসে আক্রান্ত হয়েছে। মৃত্যুবরণ করতে হয়েছে মানুষকে।
অতীতে মরণঘাতি এমন অধিকাংশ রোগেরই প্রতিষেধক বা ভ্যাকসিন আবিষ্কৃত হয়েছে। অনেক রোগ প্রায় ১০০ শতাংশ নিয়ন্ত্রণে আনতে পেরেছে চিকিৎসাবিজ্ঞানীরা। ফলে আজকাল আর মানুষকে কলেরা, ডায়রিয়া, বসন্ত, টাইফয়েড যক্ষ্মা গ্যাস্ট্রিক ইত্যাদি রোগে মৃত্যুবরণ করতে হয় না। এরপরও কিছুদিন পরপর নতুন রোগের দেখা মেলে নতুন কোনো ভাইরাসে আক্রান্ত হয় মানুষ তবে তাতে হার মানে না চিকিৎসাবিজ্ঞানীরা। তারাও নিরলসভাবে সে সব রোগের প্রতিষেধক আবিষ্কার করেন। মানুষকে বাঁচিয়ে রাখেন।
রোগ-বালাই, মহামারী কোনো নির্দিষ্ট সম্প্রদায়ের জন্য আসে না এবং এর প্রতিরোধক নির্দিষ্ট সম্প্রদায়ের জন্যই শুধু কাজ করে তা নয়। রোগ যেমন সীমান্ত চেনে না, সম্প্রদায়, জাত ইত্যাদি চেনে না তেমনি এর ওষুধও শুধুমাত্র একটি সম্প্রদায়ের আরোগ্যের জন্য কাজ করে না। আর বর্তমানে যোগাযোগ ব্যবস্থার উন্নতি, ব্যবসা-বাণিজ্য ও শিক্ষা-দীক্ষার কারণে এক দেশের সঙ্গে অন্যদেশ, এক দেশের মানুষদের সঙ্গে অন্যদেশের মানুষের যোগাযোগ ও ঘনিষ্ঠতা বৃদ্ধি পেয়েছে। ফলে এক দেশে সৃষ্ট বিপর্যয় সহজেই অন্যদেশকে আক্রান্ত করছে, অন্যদেশের মানুষ সহজেই সংক্রমিত হচ্ছে। রোগ সংক্রমণের কোনো জাত-পাত নেই, ডান-বাম নেই, মুসলিম-অমুসলিম নেই। এটিকে আল্লাহর গজব বলে চিহ্নিত করে কিংবা একটি দেশের সমস্যা বলে চিহ্নিত করে নিজেদের নিরাপদ ভাবলেও হবে না, চলবে না।
আজ বিশ্ব অর্থনৈতিক ব্যবস্থায় একটি দেশ, যদি তা চীনের মতো হয়, তার দুর্দশা দেখে আত্মতৃপ্তি লাভ করারও কিছু নেই। কারণ চীনের অর্থনীতি ভেঙে পড়লে, চীনের উৎপাদন ব্যাহত হলে, চীন ক্ষতিগ্রস্ত হলে বিশ্ব অর্থনীতিও তা থেকে রেহাই পাবে না। এমনকি অন্যতম পরাক্রমশালী মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রও। চীনে এই ভাইরাস ছড়িয়ে পড়ার খবরে মার্কিনিরা দুপেগ হুইস্কি বেশি খেলেও তাদের হইস্কির পেগে টানাটানি শুরু হবে চীনের এই পরিস্থিতি প্রলম্বিত হলে। কাজেই মানবিক বিপর্যয়কে সবসময় মানবিক দৃষ্টিভঙ্গিতেই দেখতে হবে। সহমর্মিতার চোখে দেখতে হবে। সহানুভূতির সঙ্গে দেখতে হবে। গজবই যদি হয় সে গজবকে সারা জাহানের বলে ভাবতে হবে। হাততালি দেওয়ার সুযোগ নেই মোটেও।
তবে এই ভাইরাস একটি বিষয় চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দিল বটে। সেটি হলো যে দেশ যত পরাক্রমশালীই হোক না কেন তা ভেঙে পড়তে খুব বেশি কিছুর প্রয়োজন হয় না। এক করোনাভাইরাস চীনের মতো এক নম্বর অর্থনৈতিক পরাশক্তির ভিত নাড়িয়ে দিয়েছে। এত নিরাপত্তাব্যবস্থা, এত মারণাস্ত্র, এত যুদ্ধ প্রস্তুতি সবকিছুকে ব্যর্থ করে দিয়ে একটি ভাইরাস জানিয়ে দিচ্ছে সবকিছুই বৃথা প্রচেষ্টা। মানুষকে বাঁচানোর পথই সর্বোত্তম এবং মানুষ ও মানবসভ্যতাকে বাঁচিয়ে রাখার জন্যই সব শক্তিকে একত্রিত হতে হবে।
মুসলিম, অমুসলিম, চীন-মার্কিন বলে আলাদা কোনো সত্তা নেই মানুষের। বিশ্বের সব মানুষ এক ও অভিন্ন সত্তা।
মানুষ বাঁচলেই মানবসভ্যতা টিকে থাকবে।

সর্বশেষ সংবাদ