রোজিনার কারাবাস, সম্পাদকীয় নীতি ও সম্পাদকের দায়»কামরুল হাসান বাদল

পোস্ট করা হয়েছে 22/05/2021-10:32am:    কবি,সাংবাদিক লেখক টিভি ও সাংস্কৃতিক ব্যক্তিত্ব » প্রথম আলোর সম্পাদকীয় নীতির সঙ্গে আমি একমত নই। অবশ্য আমার একমত হওয়া না হওয়া নিয়ে পত্রিকাটির কিছু যায় আসে না। কিছু কিছু ক্ষেত্রে পত্রিকাটির ভূমিকা বিতর্কিত ও রহস্যজনক। একইধরনের অভিযোগে অনেকেই পত্রিকাটি পড়েন না। তবে প্রচার সংখ্যার দিক থেকে পত্রিকাটির অবস্থান শীর্ষে। বলা যেতে পারে প্রথম আলো কারো কাছে নন্দিত এবং একই সঙ্গে কারো কাছে নিন্দিত। পত্রিকাটি সাংবাদিকবান্ধব নয় বলেই আমার মতো অনেকে মনে করেন। অনেকে প্রথম আলোর কারণে বাংলাদেশে সাংবাদিকতা পেশাটি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে বলেও মনে করেন। সে-ই প্রথম আলোর সাংবাদিক রোজিনা ইসলামকে হেনস্তা ও তার বিরুদ্ধে সরকারি গোপন নথি চুরির অভিযোগ আনা এবং জামিন না দিয়ে কারাগারে প্রেরণের বিরুদ্ধে লেখার পর অনেকে ক্ষুব্ধ প্রতিবাদ জানিয়ে প্রশ্ন করেছেন- আমি কেন প্রথম আলোর পক্ষে লিখলাম। আমি তাদের বোঝাতে চেয়েছি যে, আমি মূলত মুক্ত সাংবাদিকতা, অনুসন্ধানী প্রতিবেদন করার পরিবেশ এবং দুর্নীতির বিরুদ্ধে অবস্থান নিয়েছি। এটি যেকোনও গণমাধ্যমকর্মীর বেলাতেও করতাম। কারণ এ ঘটনার সঙ্গে বাংলাদেশের অবাধ ও মুক্ত সাংবাদিকতার স্বার্থ জড়িত। আমি তাদের জন্য মার্টিন নিম্যোলারের কবিতাটি উদ্ধৃতি দিলাম- যখন ওরা প্রথমে কমিউনিস্টদের জন্য এসেছিল, আমি কোনো কথা বলিনি, কারণ আমি কমিউনিস্ট নই। তারপর যখন ওরা ট্রেড ইউনিয়নের লোকগুলোকে ধরে নিয়ে গেল, আমি নীরব ছিলাম, কারণ আমি শ্রমিক নই। তারপর ওরা যখন ফিরে এলো ইহুদিদের গ্যাস চেম্বারে ভরে মারতে,আমি তখনও চুপ করে ছিলাম, কারণ আমি ইহুদি নই। আবারও আসল ওরা ক্যাথলিকদের ধরে নিয়ে যেতে,আমি টুঁ শব্দটিও উচ্চারণ করিনি, কারণ আমি ক্যাথলিক নই। শেষবার ওরা ফিরে এলো আমাকে ধরে নিয়ে যেতে, আমার পক্ষে কেউ কোন কথা বলল না, কারণ, কথা বলার মত তখন আর কেউ বেঁচে ছিল না।” ফার্স্ট দে কেইম, মার্টিন নিম্যোলার, (১৮৯২-১৯৮৪) আজ প্রথম আলোর সাংবাদিক হেনস্তার শিকার হয়েছেন বলে যদি আমি চুপ করে থাকি তাহলে কাল যখন আমাকে নাজেহাল করা হবে তখন প্রতিবাদ করার কেউ থাকবে না। বলেছিলাম, প্রথম আলো সাংবাদিকতা পেশার ক্ষতি করেছে। সেটি কেমন? তার তরতাজা উদাহরণটি হলো রোজিনাকে হেনস্তা করে কারাগারে পাঠানোর প্রতিবাদে সাংবাদিক সমাজের আন্তরিক অংশগ্রহণ। সারাদেশব্যাপী স্বতস্ফূর্ত এসব প্রতিবাদ সমাবেশে প্রথম আলোর উপসম্পাদক আনিসুল হক থেকে শুরু করে অনেক সাংবাদিক উপস্থিত হয়েছেন। দেশের সাংবাদিকমহলের সবাই জানেন এধরনের আন্দোলন অন্য পত্রিকা বা টিভির বেলায় ঘটলে সে প্রতিবাদ সমাবেশে প্রথম আলোর কেউ উপস্থিত হতে পারতেন না। শুধু তাই নয় রাজধানীসহ দেশের সাংবাদিক ইউনিয়ন এমনকি প্রেস ক্লাবে পর্যন্ত প্রথম আলো তার সাংবাদিকদের যেতে নিরুৎসাহিত করে। আরও বেশকিছু নিয়ম প্রবর্তন করেছে প্রথম আলো যার দ্বারা এ পেশা ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। সেসব কথা আজ আর আলোচনা করছি না। যেটুকু রোজিনা সম্পর্কিত সেটুকুই বললাম। প্রথম আলোর জ্যেষ্ঠ সাংবাদিক রোজিনা ইসলামকে নিয়ে বিস্তারিত লেখার দরকার নেই। ইতিমধ্যে পাঠকরা অনেককিছুই জেনেছেন। আমি শুধু দুটো বিষয়ে আলোচনার সূত্রপাত করতে চাই। এ ঘটনার পরদিন একজন অনুসন্ধানী সাংবাদিকের সঙ্গে ন্যাক্কারজনক আচরণের প্রতিবাদে স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের প্রেসব্রিফিং বয়কট করে সচিবালয় বিট করা বিভিন্ন গণমাধ্যমের সাংবাদিকরা। পরদিন স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের পক্ষ থেকে বিভিন্ন পত্রিকায় বিশাল বিজ্ঞাপন ছাপানো হয় যেখানে মন্ত্রণালয় তাদের মতো করে ঘটনার ব্যাখ্যা দেয়। সেখানে তারা একতরফা বক্তব্য তো দেয়-ই উপরন্তু রোজিনার চরিত্র হননেরও চেষ্টা করে তারা। ‘সাংবাদিক রোজিনা ইসলামের অনভিপ্রেত আচরণ ও তৎপরবর্ত্তী ঘটনা সম্পর্কে বিভ্রান্তিকর প্রচারণা বিষয়ে স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণ মন্ত্রণালয়ের ব্যাখা’ শিরোনামে ওই বিজ্ঞাপনে তদন্তাধীন একটি বিষয় নিয়ে যেসব মন্তব্য করা হয়েছে তা অশোভন ও মানহানিকর। ঘটনার প্রকৃত সত্য উৎঘাটনে যেখানে তারাই (মন্ত্রণালয়) একটি তদন্ত কমিটি গঠন করেছে সেখানে সে কমিটির প্রতিবেদন প্রকাশের আগে কী করে একতরফা বক্তব্য দিতে পারে মন্ত্রণালয়। সরকারি অর্থ পক্ষান্তরে যার মালিক জনগণ, তাদের অর্থ অপচয় করে নিজেদের অপকর্ম ঢাকা দেওয়ার এ প্রয়াস রীতিমতো একটি অপরাধ। তাদের ভাষ্য অনুযায়ী, রোজিনা গোপন নথি চুরি করেছেন। যদি তাই হয়, সে কারণে যদি রোজিনা দোষী হয় তাহলে কর্তব্য পালনে গাফেলতি, রাষ্ট্রীয় গোপন তথ্য যথাযথভাবে সংরক্ষণ করতে না পারায় সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের বিরুদ্ধেও কি অভিযোগ আনা হবে না? নথিগুলো এমন অবস্থায় থাকবে কেন যে কেউ তা নিয়ে চটপট ছবি তুলে নেবে, কিছু তার ব্যাগের মধ্যে ঢুকিয়ে নেবে? এর দায় কি কর্মকর্তাদের কেউ নেবে না? রোজিনা ইসলামকে সচিবালয়ে সবাই চেনেন। স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের বিভিন্ন অনিয়ম নিয়ে প্রতিবেদন করে তিনি প্রশংসিত হয়েছেন। একজন অনুসন্ধানী প্রতিবেদক হিসেবে তিনি আন্তর্জাতিকক্ষেত্রেও প্রশংসিত এবং পুরস্কারপ্রাপ্ত। এমন একজন সুপরিচিত সাংবাদিক উপসচিবের কক্ষ থেকে ফাইল চুরি করলেন, এটা কি আদৌ বিশ্বাসযোগ্য? অন্যদিকে এ বিজ্ঞাপনটি প্রকাশ করেছে প্রথম আলো ঘরানার আরেকটি পত্রিকা ডেইলি স্টারও। প্রথম আলো এবং ডেইলি স্টার একই প্রকাশনা প্রতিষ্ঠানের মালিকানাধীন প্রতিষ্ঠান। ডেইলি স্টারের সম্পাদক মাহফুজ আনাম কিছুদিন আগেও প্রথম আলোর প্রকাশক ছিলেন। তিনি এ ঘটনার নিন্দা জানিয়ে একটি মন্তব্য প্রতিবেদনও লিখেছেন। অথচ তারই পত্রিকায় এ বিজ্ঞাপনটি প্রকাশ হয়েছে। পত্রিকার স্বাভাবিক নীতি হলো সম্পাদকীয় নীতির পরিপন্থী কোনো বিজ্ঞাপন প্রকাশ না করা। সাধারণত পত্রিকার নীতির সঙ্গে সাংঘর্ষিক হয় এমন বিজ্ঞাপন প্রচার করা হয় না। অন্য পত্রিকা তো দূরের কথা প্রথম আলোর ঘরের পত্রিকা ডেইলি স্টারই কিছু টাকার লোভ (!) থেকে নিজেদের সংবরণ করতে পারেনি। অথচ এ মাহফুজ আনাম সাহেবই সংবাদপত্র পরিষদের সভাপতি হিসেবে রোজিনার ঘটনার ওপর এক বিবৃতি দিয়েছেন। মাহফুজ আনাম সাহেব সম্ভবত তার ভুলটি বুঝতে পেরেছেন। ফলে বিজ্ঞাপন ছাপানোকে যুক্তিযুক্ত করতে একটি ব্যাখ্যাও দিয়েছেন তিনি। পাঠকদের সুবিধার্থে তা তুলে ধরছি, ‘আমরা কেন স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের বিজ্ঞাপন ছেপেছি, এ নিয়ে কিছু প্রশ্ন উঠেছে। এটি প্রকাশ করা না হলে এমন একটি সেন্সরশিপ তৈরি করা হতো, যা আমরা পুরোপুরি প্রত্যাখ্যান করি। সম্প্রতি স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় নিয়ে বেশ কিছু প্রতিবেদন প্রকাশিত হয়েছে। আমরা মনে করি, স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের দৃষ্টিভঙ্গি জানার অধিকার জনগণের আছে।’ বাংলাদেশে অধিকাংশ পত্রিকার সম্পাদক সাংবাদিক নন। মালিক হিসেবে তারা সম্পাদকের চেয়ার দখল করে থাকেন। ফলে এদের সঙ্গে সাংবাদিকদের সম্পর্কটি সহকর্মীর মতো নয়; মালিক-কর্মচারীর মতো। এরা সাংবাদিকদের ব্যবহার করেন নিজেদের ব্যবসা-বাণিজ্যসহ নানান কাজে। বাংলা ছবির একটি গানের কলি মনে পড়ল আমার- ‘আমার রক্ত-ঘাম বুকের পাঁজর দিয়ে তোমার প্রাসাদ তৈয়ার/ সাত মহলার ওই স্বপ্নচূড়ায় বসে ভাবো একা দাবিদার…’। অনেক সাংবাদিক এমন কাজ করে আত্মতুষ্টিও লাভ করেন। কিন্তু দুঃখজনক হলো প্রথম আলোর সম্পাদক একজন সাংবাদিক হলেও সাংবাদিকদের (সমগ্রার্থে) কল্যাণে তেমন কোনো ভূমিকা রাখেননি বরং তিনি সাংবাদিকতাকেই জটিল করে তুলেছেন। আজ তার পত্রিকার এক সাংবাদিক অন্যায়ের শিকার হয়েছেন বলে যেরূপ আন্দোলন হচ্ছে এবং সেখানে প্রথম আলোর সাংবাদিকরা আসছেন কাল অন্য পত্রিকার কারো জন্য আন্দোলন হলে সেখানে যেন প্রথম আলোর সাংবাদিকরা নির্ভয়ে উপস্থিত থাকতে পারেন সে পরিবেশ তিনি তৈরি করবেন। স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় ও অধিদপ্তর নিয়ে অসন্তোষের শেষ নেই। এ অধিদপ্তরে কর্মরত একজন গাড়িচালকের অবৈধ সম্পত্তির খবর জেনে আমাদের আক্কেলগুড়ুম হয়েছিল তা বেশিদিনের নয়। কাজেই এ মন্ত্রণালয়ের সবাই ধোয়া তুলসি পাতা নন। একজন গাড়িচালকের অর্থবিত্ত দেখে সে সময় অনেকে বলেছিলেন, চালকের এই হাল হলে বড় বাবুদের কী হাল হবে তবে! দুর্নীতি নিয়ে রিপোর্ট বন্ধ না করে দুর্নীতিবাজদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া দরকার। যারা অনুসন্ধানী রিপোর্ট করেন তারা অনেক সময় নিজের জীবনকে ঝুঁকিতে ফেলেও নিজ দায়িত্ব সম্পাদন করেন। পত্রিকায় ফাটাফাটি রিপোর্ট হলে তার বাহবা নেন, সুবিধা ভোগ করেন মালিক-সম্পাদক আর যদি জেলে যেতে হয় তখন যেতে হয় রিপোর্টারকেই। মালিক-সম্পাদকরা তখন বিজ্ঞাপনের টাকা ভাগাভাগি করেন। রোজিনাকে হেনস্তা করা, তাকে চোর হিসেবে সাব্যস্ত করা এবং তাকে জেলের ভাত খাওয়ানো নিয়ে আমি নিজে মন্তব্য করতে চাই না। এ প্রসঙ্গে পররাষ্ট্রমন্ত্রীর প্রতিক্রিয়াটি তুলে দিচ্ছি, “এটা খুবই দুঃখজনক। কারণ শেখ হাসিনার সরকার হচ্ছে সংবাদপত্রবান্ধব সরকার। আমাদের লুকানোর কিছু নেই। যে ঘটনাটি ঘটেছে তা খুবই দুঃখজনক। সেটা হেলথ মন্ত্রণালয়ের ম্যানেজ করা উচিত। আমি বলতে পারি, এটা আমার সরকারের জন্য দুঃখজনক ঘটনা। গুটি কতক লোকের কারণে এই ঘটনাটি ঘটেছে। আমি জানি, পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় হিসেবে এটা আমাদের ফেইস করতে হবে। অনেকে আমাদের এই নিয়ে প্রশ্ন করবে। আমরা এ ধরনের ঘটনা চাই না। যেহেতু এটি বিচারাধীন আছে, এ বিষয়ে বিস্তারিত কথা বলতে পারি না। এটা আমার বিষয়ও না। এই ধরনের পুনরাবৃত্তি যেন না হয় সেটাই আশা করবো। আমরা সবাই চাই, সংবাদমাধ্যম দেশের বিরাট কাজ করছে। আপনাদের কারণেই আমরা সেই বালিশের কাহিনী শুনেছি। আপনাদের কারণে লাখ টাকা সুপারি গাছের কথা শুনেছি, সাহেদ করিমের তথ্য পেয়েছি। আপানারা খুব সাহায্য করছেন। আপনারা সরকারের সাহায্য করেন। কোনো কোনো জায়গায় কিছুটা অসুবিধাজনক অবস্থার সৃষ্টি হলে আমাদের সরকারের জন্য অসুবিধা হয়।” যারা মিনমিনে গলায় দুর্নীতিবাজ কিছু আমলাকে বাঁচাতে চাইছেন তারা দয়া করে পররাষ্ট্রমন্ত্রীর এ বক্তব্যটি অনুধাবনের চেষ্টা করবেন।

সর্বশেষ সংবাদ