বাংলাদেশের অকৃত্রিম বন্ধু ইন্দিরা গান্ধী:আমাদের ঋণ শোধবার দায় » কামরুল হাসান বাদল

পোস্ট করা হয়েছে 14/03/2021-08:56am:    স্বাধীনতার সুবর্ণজয়ন্তীতে আরেকটি ঋণ শোধবার সুযোগ এসেছে আমাদের। মুক্তিযুদ্ধের কঠিন সময়ে বঙ্গবন্ধুর অবর্তমানে যিনি ছিলেন বাংলাদেশের অভিভাবক, অকৃত্রিম বন্ধু, ভারতের তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী মিসেস ইন্দিরা গান্ধীকে যথার্থ সম্মান ও স্মরণ করার উপলক্ষ্য। সুখবর হলো, মহান মুক্তিযুদ্ধে শহীদ ভারতীয় সেনাদের স্মরণে আশুগঞ্জে যে স্মৃতিস্তম্ভ নির্মাণের উদ্যোগ নিয়েছিল সরকার স্বাধীনতার সুবর্ণজয়ন্তী উপলক্ষে আয়োজিত অনুষ্ঠানমালার মধ্যেই তার ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপনের পরিকল্পনা নিয়েছে মুক্তিযুদ্ধ বিষয়ক মন্ত্রণালয়। মুক্তিযুদ্ধ বিষয়ক মন্ত্রী আ ক ম মোজাম্মেল হক বলেছেন, বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা এবং ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদী যেন যৌথভাবে এ ভিত্তিফলক উন্মোচন করতে পারেন, সেই চেষ্টাই তারা করছেন। তবে বিষয়টি এখনও চূড়ান্ত হয়নি। স্বাধীনতার সুবর্ণজয়ন্তী উপলক্ষে ১৭ থেকে ২৬ মার্চ জাতীয় প্যারেড গ্রাউন্ডে দশ দিনব্যাপী অনুষ্ঠানমালার আয়োজন করছে সরকার। ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদিরও সেই কর্মসূচিতে যোগ দেওয়ার কথা রয়েছে। মোদি ছাড়াও এ উপলক্ষে চলতি মাসে ঢাকা সফর করবেন দক্ষিণ এশিয়ার আরও তিন শীর্ষ নেতা। এদের মধ্যে রয়েছেন, নেপালের রাষ্ট্রপতি বিদ্যা দেবী ভান্ডারি ও মালদ্বীপের রাষ্ট্রপতি ইবরাহিম মোহামেদ সলিহ ও শ্রীলঙ্কার প্রধানমন্ত্রী মাহিন্দা রাজাপাকসে। জানা গেছে, তারা সবাই স্বাধীনতা, বঙ্গবন্ধু বা অন্য বিষয়ে একটি করে লেকচার দেবেন। এছাড়া দ্বিপক্ষীয় বৈঠকও অনুষ্ঠিত হবে। এ বিষয়ে মুক্তিযুদ্ধ বিষয়ক মন্ত্রী সাংবাদিকদের বলেন, “আমাদের একটা প্রকল্প আছে, বাংলাদেশের মিত্র বাহিনীর যে সদস্যরা এ দেশে জীবন দিয়েছেন, তাদের স্মরণে একটা স্মৃতিস্তম্ভ করা। এই প্রকল্প ইতোমধ্যে পাস হয়ে গেছে। সেটা হতে পারে যে স্মৃতিস্তম্ভের ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপনের জন্য আমরা যৌথভাবে আমাদের মাননীয় প্রধানমন্ত্রী এবং ভারতের প্রধানমন্ত্রীকে আহ্বান জানাতে পারি। এ বিষয়ে এখনও কোনো সিদ্ধান্ত হয়নি, তবে সম্ভাবনা আছে।” পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় সূত্রে জানা গেছে, ভুটানের রাজা জিগমে খেসার নামগিল ওয়াংচুক ও কানাডার প্রধানমন্ত্রী জাস্টিন ট্রুডোর ভিডিও বক্তব্য ১৭ থেকে ২৬ শে মার্চের মধ্যে যে কোনও সময়ে প্রকাশ করা সম্ভব হবে। ওই সময়ে বা বছরের বিভিন্ন সময়ে রাশিয়ার প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিন, কম্বোডিয়ার প্রেসিডেন্ট হুন সেন, জাপানের প্রধানমন্ত্রী ইয়োশিহিদে সুগা, পোপ ফ্রান্সিস, সৌদি আরবের যুবরাজ মোহাম্মদ বিন সালমান বিন আব্দুল আজিজ আল সৌদ, সংযুক্ত আরব আমিরাতের যুবরাজ শেখ মোহাম্মেদ বিন জায়েদ বিন সুলতান আল নাহিয়ানসহ বিভিন্ন নেতা বক্তব্য দিবেন বা ঢাকা সফর করতে পারেন। এ ধরনের উদ্যোগ স্বাধীনতার সুবর্ণ জয়ন্তীকে বর্ণাঢ্য ও গৌরবদীপ্ত করবে অবশ্যই। স্বাধীনতার পর থেকে আজ পর্যন্ত দীর্ঘ এই সময়ে ভারতের সঙ্গে বাংলাদেশের পারষ্পরিক সম্পর্কের পারদ ওঠানামা করলেও অস্বীকার করার উপায় নেই যে, আমাদের মহান মুক্তিযুদ্ধে এই দেশটি সহযোগিতা না করলে বিজয় অর্জন হয়ত সম্ভব হতো না। ১৯৭১ সালে মুক্তিযুদ্ধকালীন এদেশের এককোটি মানুষকে ভারত আশ্রয় দিয়েছিল। খাদ্য, বাসস্থান ও চিকিৎসার ব্যবস্থা করেছিল। প্রবাসী সরকারকে সহযোগিতা দেওয়া ছাড়াও মুক্তিযোদ্ধাদের ট্রেনিং ও অস্ত্র সাহায্য দিয়েছিল। এতকিছুর পেছনে ভারতের জনগণ ছাড়াও যে মহান মানুষটির বড় অবদান আছে, যার নাম বাংলাদেশের স্বাধীনতার সঙ্গে জড়িয়ে আছে তিনি ভারতের তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী মিসেস ইন্দিরা গান্ধী। তিনি ও তার সরকার তো সাহায্য করেছেনই, পাশাপাশি বাংলাদেশের পক্ষে বিশ্বজনমত গড়তে তিনি চষে বেরিয়েছেন দেশের পর দেশ। তারই আন্তরিক উদ্যোগে তৎকালীন অন্যতম পরাশক্তি সোভিয়েত ইউনিয়ন বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধের পক্ষে জোরালো ভূমিকা নিয়েছিল। সে সময় জাতিসংঘে পাকিস্তানের পক্ষে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের অপতৎপরতাকে প্রতিহত না করলে আমাদের স্বাধীনতা যুদ্ধ আরও কঠিন পরিস্থিতিতে পড়তো। এসব কারণে সোভিয়েত ইউনিয়নের প্রতিও আমাদের কৃতজ্ঞতার শেষ নেই। ইন্দিরা গান্ধী ছিলেন বাংলাদেশের অকৃত্রিম বন্ধু। দেশ স্বাধীনের পরপরই বঙ্গবন্ধু মিসেস গান্ধীকে অনুরোধ করেছিলেন শত্রুমুক্ত বাংলাদেশ থেকে ভারতীয় সৈন্য প্রত্যাহারের। কথিত আছে, ১৯৭২ সালের ১৭ মার্চ বঙ্গবন্ধুর জন্মদিনের কয়েকদিন আগে ইন্দিরা গান্ধী বঙ্গবন্ধুকে বলেছিলেন, এই জন্মদিনে তিনি (ইন্দিরা গান্ধী) বঙ্গবন্ধুকে কী উপহার দিতে পারেন। উত্তরে বঙ্গবন্ধু বলেছিলেন, আপনার দেশের সেনাবাহিনীকে ফিরিয়ে নেওয়াই হবে আমার জন্য বড় উপহার। বঙ্গবন্ধুর জন্মদিনে এ উপহার দিয়ে বিশ্বে একটি অনন্য নজির স্থাপন করেছিলেন জওহরলাল নেহেরুর কন্যা ভারতের অন্যতম সফল প্রধানমন্ত্রী মিসেস ইন্দিরা গান্ধী। বিজয়ের পর সম্পূর্ণভাবে মিত্রবাহিনী ফিরিয়ে নেওয়ার ঘটনা বাংলাদেশ ছাড়া আর কোথাও ঘটেনি। মুক্তিযুদ্ধের শুরু থেকে নানাভাবে সহায়তা করলেও ডিসেম্বরের প্রথম সপ্তাহে ভারতীয় সশস্ত্র বাহিনী এই যুদ্ধে সরাসরি জড়িয়ে পড়ে। মুক্তিবাহিনী ও ভারতীয় বাহিনীর সমন্বয়ে গঠিত মিত্রবাহিনীর কাছে ১৬ই ডিসেম্বর আত্মসমর্পণ করে পাকিস্তান সেনাবাহিনী। ওই যুদ্ধে ১ হাজার ১৬১ ভারতীয় সেনা শহীদ হয়েছিলেন। এর মধ্যে ৯ ডিসেম্বর ব্রাহ্মণবাড়িয়ার আশুগঞ্জে পাকিস্তানি বাহিনীর হাতে মিত্র বাহিনীর তিন শ-রও বেশি সেনা শহীদ হন। সে কারণে দিনটি পালিত হয় ‘আশুগঞ্জ ট্র্যাজেডি’ দিবস হিসেবে। এ কারণেই মিত্র বাহিনীর শহীদ সদস্যদের স্মরণে এ স্থানে অর্থাৎ ব্রাহ্মণবাড়িয়ার আশুগঞ্জে ঢাকা-সিলেট মহাসড়কের পাশে একটি স্মৃতিস্তম্ভ নির্মাণের সিদ্ধান্ত হয় এবং এর জন্য ২০১৭ সালেই একনেকে ১৬ কোটি ৩০ লাখ টাকার একটি প্রকল্প পাস হয়। কিন্তু জমি পেতে দেরি হওয়ায় প্রকল্পের বাস্তবায়ন বিলম্বিত হয়। জমি পাওয়ার পর ২০২০ সালের ফেব্রুয়ারিতে মেয়াদ বাড়িয়ে প্রকল্প সংশোধন করা হয়। নবম জাতীয় সংসদ নির্বাচনে জয়ী হয়ে মুক্তিযুদ্ধে নেতৃত্বদানকারী দল আওয়ামী লীগ সরকার গঠনের পর বাংলাদেশের স্বাধীনতা সংগ্রামে অবদান রাখা বিদেশি বন্ধুদের সম্মাননা জানানোর সিদ্ধান্ত নেয়। ২০১১ সালে ভারতের সাবেক প্রধানমন্ত্রী প্রয়াত ইন্দিরা গান্ধীকে সম্মাননা জানানো হয়। পরে সম্মাননা দেওয়া হয় ভারতের সাবেক প্রধানমন্ত্রী অটল বিহারী বাজপেয়ী এবং সাবেক রাষ্ট্রপতি প্রণব মুখার্জিকে। এরপর ২০১৭ সালের এপ্রিলে ভারত সফর করে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধে আত্মোৎসর্গকারী ভারতীয় সশস্ত্র বাহিনীর সাত যোদ্ধার পরিবারের সদস্যদের হাতে সম্মাননা স্মারক তুলে দেন। মুক্তিযুদ্ধ বিষয়ক মন্ত্রী মোজাম্মেল হক বলেন, “ভারতীয় সেনাবাহিনীর যারা এদেশে জীবন দিয়েছেন মিত্র বাহিনীর সদস্য হিসেবে, ইতোমধ্যে তাদের সম্মাননায় মাননীয় প্রধানমন্ত্রী কয়েক বছর আগে ভারত সফর করে নিজ হাতে টোকেন হিসেবে কিছু দিয়েছেন। বাকিগুলো আর দেওয়া যায়নি। এরপর করোনাভাইরাসের কারণে এক বছর ধরে এসব সম্মাননা আমাদের কাছে জমা পড়ে আছে।” তিনি বলেন, “আমাদের মিশনের মাধ্যমে সেগুলো দেওয়ার জন্য বাংলাদেশ ব্যাংকে গচ্ছিত রাখা আছে। বৈশ্বিক অবস্থা ঠিক হলে সেগুলো দেওয়া হবে। করোনাভাইরাসের এই পরিস্থিতিতে ভারতও সেগুলো এখন নিতে আগ্রহী না। ভারতের বিভিন্ন অঞ্চল থেকে এসে সেগুলো এখন নেওয়া সম্ভব না। পরিবেশ যখন অনুকূলে আসবে, তখন সেগুলো পৌঁছে দেওয়া হবে।” আসলে অনেক আগেই এমন সিদ্ধান্ত গ্রহণ করা উচিত ছিল। জাতির পিতা বেঁচে থাকলে এমন কাজ অনেক আগেই হতো। কিন্তু দুর্ভাগ্য হচ্ছে ১৯৭৫ সালে তাঁকে সপরিবারে হত্যা করে ঘাতকরা এ দেশকে আবার পাকিস্তানের আদলে ও আদর্শে ‘বাংলাস্তান’-এ রূপান্তরিত করেছিল। ফলে মোশতাক -জিয়া-এরশাদ-খালেদার ‘বাংলাস্তানে’ জাতির পিতা, তাঁর আদর্শ, মুক্তিযুদ্ধ ও তার সহযোগী বন্ধরা শুধু উপেক্ষিতই হয়েছে। এমন কাজের মাধ্যমে সরকার একটি জাতীয় দায়িত্ব পালন করছে বলে মনে করি। কারণ কৃতজ্ঞতা জ্ঞাপন করা সভ্য আচরণেরই একটি অংশ। এমন কাজে ও স্বীকৃতি প্রদানের মাধ্যমে বিশ্বদরবারে বাংলাদেশের ভাবমূর্তি উজ্জ্বল হবে। সভ্য, মার্জিত ও কৃৃতজ্ঞ জাতি হিসেবে পরিগনিত হবে। এ প্রসঙ্গে আমি আরেকটি দাবি জানাতে চাই আর তা হলো, সুবর্ণ জয়ন্তীর এই মাহেন্দ্রক্ষণে রাজধানীর কোনো গুরুত্বপূর্ণ স্থানে বাংলাদেশের অকৃত্রিম বন্ধু, মহান নেত্রী, ইন্দিরা গান্ধীর একটি ম্যুরাল বা ভাস্কর্য নির্মাণ করা হোক। আমাদের আগামী প্রজন্ম এই মহান নেত্রীর বিষয়ে আগ্রহী হোক, মুক্তিযুদ্ধে তার অসামান্য অবদানের কথা দেশের মানুষ জানুক এবং সে সঙ্গে তার প্রতি শ্রদ্ধাজ্ঞাপন করুক। কামরুল হাসান বাদল| ১৩ মার্চ, ২০২১ লেখক, কবি ও সাংবাদিক

সর্বশেষ সংবাদ