মুজিব বর্ষে যেন ভুলে না যাই কামরুল হাসান বাদল লেখক : কবি ও সাংবাদিক

পোস্ট করা হয়েছে 04/02/2020-10:49am:    দক্ষিণ এশিয়ার একটি ছোট দেশের মাত্র সাড়ে সাত কোটি জনগণের (তৎকালীন) নেতা হওয়া সত্ত্বেও বঙ্গবন্ধু যে একইসাথে বিশ্বজনীন নেতা, তাঁর ভাবনা ও অনুধ্যানে যে সারা মানবজাতি তা মূর্ত হয়ে ওঠে তার নিজেকে নিয়ে করা একটি মন্তব্যে। ইংরেজিতে লেখা দিনলিপির একটি পাতায় তিনি লিখেছেন, ‘একজন মানুষ হিসাবে সমগ্র মানবজাতি নিয়েই আমি ভাবি। একজন বাঙালি হিসাবে যা কিছু বাঙালিদের সঙ্গে সম্পর্কিত তাই আমাকে গভীরভাবে ভাবায়।
এ নিরন্তর সম্পৃক্তির উৎস ভালোবাসা। অক্ষয় ভালোবাসা, যে ভালোবাসা আমার রাজনীতি এবং অস্তিত্বকে অর্থবহ করে তোলে’। নিজ দেশের মানুষকে এত ভালোবাসা এবং তা অকপটে প্রকাশ করার নজির বিশ্ব ইতিহাসে খুব বেশি একটা নেই। এ ভালোবাসা তাঁর শক্তি, এ ভালোবাসা তাঁর দুর্বলতা। এক বিদেশি সাংবাদিক তাঁকে প্রশ্ন করেছিলেন, ‘আপনার সবচেয়ে বড় শক্তি কী? উত্তরে তিনি বলেছিলেন, ‘আমার সবচেয়ে বড় শক্তি আমি দেশের মানুষকে ভালোবাসি। সে সাংবাদিক ফের প্রশ্ন করলেন, ‘আপনার বড় দুর্বলতা কী? ‘আমার বড় দুর্বলতা হচ্ছে আমি তাদেরকে খুব বেশি ভালোবাসি’। বঙ্গবন্ধু উত্তর দিয়েছিলেন।
বিশ্বের স্বাধীনতা যুদ্ধের ইতিহাসে উল্লেখযোগ্য যুদ্ধ বাংলাদেশের নয়মাসব্যাপি মুক্তিযুদ্ধ পরিচালিত হয়েছিল তাঁর অবর্তমানে। তাঁকে সে সময় পাকিস্তানি জান্তারা তৎকালীন পশ্চিম পাকিস্তানে বন্দি করে রেখেছিল। স্বাধীনতার পর ১৯৭২ সালের ১০ জানুয়ারি তিনি স্বাধীন দেশে ফিরে আসেন। সেদিন রেসকোর্স ময়দানে, যার নামকরণ করেছিলেন তিনি তাঁর প্রিয় নেতা সোহরাওয়ার্দীর নামে, জনসভায় বলেছিলেন, ‘আমার বাংলাদেশ আজ স্বাধীন হয়েছে। আমার জীবনের সাধ আজ পূর্ণ হয়েছে। আমার বাংলার মানুষ আজ মুক্ত হয়েছে। আমার বাংলা স্বাধীন থাকবে’।
এরপরে তিনি উল্লেখ করলেন, ‘আমি খালি একটা কথা বলেছিলাম। তোমরা যদি আমাকে মেরে ফেলে দাও আমার আপত্তি নাই। মৃত্যুর পরে আমার লাশটা আমার বাঙালির কাছে দিয়ে দিয়ো। এ একটা অনুরোধ তোমাদের কাছে রাখলাম’। সে বক্তৃতায় তিনি বলেছিলেন, ‘আজ আমি বাংলার মানুষকে দেখলাম। বাংলার মাটিকে দেখলাম, বাংলার আকাশকে দেখলাম, বাংলার আবহাওয়াকে অনুভব করলাম। বাংলাকে আমি সালাম জানাই’।
রাজনীতি করতে গেলে রূঢ় বাস্তববাদী হতে হয়। রাজনীতিতে রোমান্টিকতা মানায় না। রাজনীতিকদের রোমান্টিক হওয়ার সময়ও থাকে না। লড়াই-সংগ্রাম-ক্ষমতার কথা ভাবতে ভাবতে তারা এক সময় সংবেদনশীলতাও হারিয়ে ফেলেন। বঙ্গবন্ধু এখানে ব্যতিক্রম। তিনি ছিলেন রাজনীতির কবি। মননে-চিন্তায় তাঁর সংবেদনশীল মনটি বরাবরই তাঁকে কবি করে তুলেছে। আবেগপ্রবণ করে তুলেছে। নতুবা সে কঠোর-কঠিন সময়েও তিনি কবিতার মতো কথা বলে ওঠেন কী করে। কবিগুরুর কবিতার উদ্ধৃতি দিয়ে বাঙালির মহিমা প্রকাশ করেন।
দেশের মাটিতে পা রেখেই প্রথম জনসভায় তিনি স্পষ্ট করলেন তাঁর ভূমিকা। স্পষ্ট করলেন রাষ্ট্রের ভূমিকা ও ধরন। সে সাথে ভুললেন না বন্ধুরাষ্ট্র এবং সে দেশের মহান নেত্রী ইন্দিরা গান্ধীর প্রতি কৃতজ্ঞতা জানাতেও। ‘আমার রাষ্ট্রে এ বাংলাদেশে হবে সমাজতন্ত্র ব্যবস্থা। এ বাংলাদেশে হবে গণতন্ত্র। এ বাংলাদেশে হবে ধর্মনিরপেক্ষ রাষ্ট্র। যারা জানতে চান আমি বলে দিবার চাই, আসার সময় দিল্লিতে শ্রীমতি ইন্দিরা গান্ধীর সঙ্গে সে সব আলোচনা হয়েছে। আমি আপনাদের বলতে পারি যে, আমি জানি তাকে, তাকে আমি শ্রদ্ধা করি। সে পণ্ডিত নেহেরুর কন্যা, সে মতিলাল নেহেরুর ছেলের মেয়ে। তারা রাজনীতি করেছে, ত্যাগ করেছে। তারা আজকে সেখানে ভারতের প্রধানমন্ত্রী হয়েছে। যেদিন আমি বলবো, সেদিন ভারতের সৈন্য বাংলার মাটি ছেড়ে চলে যাবে এবং তিনি আস্তে আস্তে কিছু কিছু সরায় নিচ্ছেন। তবে যে সাহায্য করেছেন, আমি আমার সাত কোটি বাঙালির পক্ষ থেকে ইন্দিরা গান্ধীকে, তার সরকারকে ভারতের জনসাধারণকে মোবারকবাদ জানাই’।
সেদিনের জনসভায় বঙ্গবন্ধু তাঁর জীবনের লক্ষ্য, পরিণতি ও সে সঙ্গে নিয়তির পূর্বাভাসও যেন ব্যক্ত করেছিলেন, ‘নতুন করে গড়ে উঠবে এ বাংলা। বাংলার মানুষ হাসবে, বাংলার মানুষ খেলবে, বাংলার মানুষ মুক্ত হাওয়ায় বাস করবে। বাংলার মানুষ পেট ভরে ভাত খাবে, এ আমার জীবনের সাধনা, এ আমার জীবনের কাম্য। আমি যেন এই দেশে এ চিন্তা করেই মরতে পারি। এ দোয়া, এই কথা বলে আপনাদের কাছ থেকে বিদায় নেবার চাই’।
বঙ্গবন্ধু জাতীয়তাবাদী নেতা ছিলেন। তবে একই সঙ্গে ছিলেন বিপ্লবী এবং আন্তর্জাতিকতাবাদীও। বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধ স্রেফ স্বাধীনতার যুদ্ধই ছিল না। এটি একটি বিপ্লব, মুক্তির বিপ্লব। সকল শৃঙ্খল থেকে, শোষণ-বঞ্চনা থেকে, ধর্মান্ধতা- মৌলবাদ থেকে, অপশাসন, দারিদ্র্য ও অসুন্দর-অকল্যাণ থেকে। তিনি বলেছিলেন, একজন মানুষ হিসেবে সমগ্র মানবজাতি নিয়েই আমি ভাবি। তাঁর এ কথার যথার্থতা ফুটে ওঠে ১৯৭৪ সালে জাতিসংঘে প্রদত্ত তাঁর ভাষণে, যে ভাষণ তিনি প্রদান করেছিলেন তাঁর মাতৃভাষা বাংলায়। জাতিসংঘে সেটিই ছিল প্রথম বাংলাভাষায় ভাষণ।
৭ মার্চ ১৯৭১ এর ভাষণটি ছিল বাঙালি জাতির জন্য দিকনির্দেশনামূলক ভাষণ, যে ভাষণটি ইতিমধ্যে বিশ্ব ঐতিহ্যের স্মারক হিসেবে ইউনেস্কো স্বীকৃতি দিয়েছে। আর ২৫ সেপ্টেম্বর ১৯৭৪ সালে জাতিসংঘে প্রদত্ত ভাষণটি ছিল বিশ্বমানবের মুক্তির উদ্দেশে। সমগ্র বিশ্বের অধিকার বঞ্চিত, নির্যাতিত নিষ্পোষিত মানুষের ন্যায়সঙ্গ অধিকার প্রতিষ্ঠা ও বিশ্বশান্তি প্রতিষ্ঠায় তাঁর দৃপ্ত সমর্থন ব্যক্ত করেন বক্তৃতায়।
বাংলাদেশ তার কয়েকদিন আগে মাত্র জাতিসংঘের সদস্যপদ লাভ করেছে। একটি নতুন সদস্য রাষ্ট্রের সরকার প্রধান হিসেবে নিজ মাতৃভাষা বাংলায় বক্তৃতাদানের সিদ্ধান্তটিও ঐতিহাসিক। যদিও তাঁকে ইংরেজিতে বক্তৃতা করার অনুরোধ করা হয়েছিল। তিনি সে অনুরোধ বিনয়ের সঙ্গে প্রত্যাখ্যান করে বাংলায় ভাষণ দেওয়ার ক্ষেত্রে অনড় থাকেন।
ভাষণে তিনি বলেন, স্বাধীনভাবে বাঁচার অধিকার অর্জনের জন্য এবং একটি স্বাধীন দেশে মুক্ত নাগরিকের মর্যাদা নিয়ে বাঁচার জন্য বাঙালি জনগণ শতাব্দির পর শতাব্দিব্যাপি সংগ্রাম করেছে। তাঁরা বিশ্বের সকল জাতির সঙ্গে শান্তি ও সৌহার্দ্য নিয়ে বাস করার জন্য আকাঙ্ক্ষিত ছিলেন। যে মহান আদর্শ জাতিসংঘ সনদে রক্ষিত রয়েছে। আমাদের লক্ষ লক্ষ মানুষ সেই আদর্শের জন্য সর্বোচ্চ ত্যাগ স্বীকার করেছে। আমি জানি শান্তি ও ন্যায় প্রতিষ্ঠার উদ্দেশ্যে সকল মানুষের আশা-আকাঙ্ক্ষা বাস্তবায়নের উপযোগী একটি বিশ্ব গড়ে তোলার জন্য বাঙালি জাতি পূর্ণ প্রতিশ্রুতিবদ্ধ’। একই ভাষণে বঙ্গবন্ধু বাংলাদেশসহ আলজেরিয়া, গিনি বিসাউ এবং ভিয়েতনামে সেনাবাহিনী কর্তৃক জনগণের ক্ষমতা কেড়ে নেওয়ার তীব্র নিন্দা জানান।
বঙ্গবন্ধু দেশের মানুষকে ভালোবাসতেন। সে কথা বহুবার, বহুস্থানে তিনি উল্লেখ করেছেন। তিনি মানুষের ওপর বিশ্বাসও রাখতেন। বক্তৃতা শেষ করতে গিয়ে তিনি বলেন, সম্মানিত সভাপতি, মানুষের অজয় শক্তির প্রতি আমার বিশ্বাস রয়েছে। আমি বিশ্বাস করি, মানুষ অসম্ভবকে জয় করার ক্ষমতা রাখে। অজয়কে জয় করার সে শক্তির প্রতি অকুণ্ঠ বিশ্বাস রেখেই আমি আমার বক্তৃতা শেষ করব’। অসাধারণ আবেগময় ভাষায় প্রদত্ত ভাষণ শেষ করার পর জাতিসংঘের সে অধিবেশনে উপস্থিত বিভিন্ন দেশের রাষ্ট্র ও সরকার প্রধান, কূটনীতিক এবং জাতিসংঘের সহযোগী বিভিন্ন সংস্থার প্রতিনিধিগণ দাঁড়িয়ে তুমুল করতালির মাধ্যমে বঙ্গবন্ধুকে সম্মান প্রদর্শন করেন। ৭ মার্চের ভাষণকে জাতিসংঘের শিক্ষা ও সংস্কৃতি বিষয়ক অঙ্গ প্রতিষ্ঠান ইউনেস্কো বিশ্ব ঐতিহ্যের স্মারক হিসেবে স্বীকৃতি দিয়েছে এবং সংরক্ষণের উদ্যোগ নিয়েছে তেমনিভাবে জাতিসংঘে প্রদত্ত ভাষণের দিনটিকে স্মরণীয় করে রাখতে নিউইয়র্ক স্টেটের গভর্নর অ্যান্ড্রু ক্যুমো ২৫ সেপ্টেম্বরকে বাংলাদেশি ইমিগ্র্যান্ট ডে হিসেবে ঘোষণা দিয়েছে।
সমাজ পরিবর্তনের কারিগর যাঁরা তাদের জন্য একজন ‘রানিং মেট’-এর প্রয়োজন হয়। তিনি বিপ্লবী হোন, জাতীয়তাবাদী নেতা হোন কিংবা দার্শনিক হোন। সক্রেটিসের শিষ্য ছিলেন প্লেটো, প্লেটোর অ্যারিস্টটল, কার্ল মার্ঙের বন্ধু সহচর অ্যাঙ্গেলস তেমনি বঙ্গবন্ধুও পেয়েছিলেন একজন যোগ্য শিষ্য, বন্ধু ও সহচর; তিনি তাজউদ্দিন আহমেদ। ধীর, স্থির, বিশ্বস্ত তাজউদ্দিন আহমেদ বঙ্গবন্ধুর যোগ্য উত্তরসূরি হয়ে উঠতে পারতেন। পারতেন বঙ্গবন্ধুর বিপ্লব, দর্শন ও চিন্তাধারা প্রচার ও প্রতিষ্ঠায় একজন বিপ্লবী সহযাত্রী। সম্পর্কটি হতে পারত ক্যাস্ত্রো ও চে গেভারার মতো। কিন্তু সেটা হয়নি। হতে দেওয়া হয়নি। যে প্রতিবিপ্লবী শক্তি বঙ্গবন্ধু এবং তাঁর আদর্শকে হত্যা করেছে তারা শুরুই করেছিল এই দুই মহান নেতার মধ্যে দূরত্ব সৃষ্টি করার মধ্য দিয়ে। বঙ্গবন্ধু সমাজতান্ত্রিক চিন্তাধারার নেতা ছিলেন। তিনি ধর্মনিরপেক্ষ চেতনার নেতা ছিলেন। আর এ ক্ষেত্রে তাজউদ্দিন আহমদ শুরু থেকেই ছিলেন তাঁর পরীক্ষিত বন্ধু।
বঙ্গবন্ধুর সান্নিধ্য থেকে যদি তাজউদ্দিন আহমেদকে দূরে সরানো না হতো তাহলে বাংলাদেশের ইতিহাস অন্য ধরনের হতো। কোনো মহৎ আদর্শ প্রতিষ্ঠার জন্য, বিপ্লব সংঘটিত করার জন্য প্রধান নেতার পাশে একজন বিশ্বস্ত সিপাহশালারের বড় প্রয়োজন হয়। বঙ্গবন্ধুর আন্দোলন-সংগ্রামের পরিকল্পনা, পরিচালনা পদ্ধতি, কৌশল পর্যালোচনা করলে আমরা লক্ষ্য করবো তিনিও অহিংস নীতি ধারণ করতেন। ছাত্রনেতা শেখ মুজিব আর পরিণত বয়সের শেখ মুজিবের রণকৌশলের মধ্যে তাই অনেক ফারাক দেখতে পাই। ছাত্রাবস্থায় হঠাৎ রেগে যাওয়া, মেজাজি এবং প্রয়োজনে মারপিট করা বঙ্গবন্ধু পরিণত বয়সে হিংসা পরিহার করে সংযত আচরণ এবং সহনীয় পদ্ধতিতে পরিস্থিতি মোকাবেলা করার পদক্ষেপ নিতেন। সত্তরের নির্বাচনে জয়ী হওয়ার পর তিনি অসম্ভব ধৈর্যের সঙ্গে পরিস্থিতি মোকাবেলা করেছেন। রক্তক্ষয়ী সংঘর্ষ যতদূর সম্ভব পরিহার করার চেষ্টা করেছেন। ঘরে ঘরে দুর্গ গড়ে তোলার জন্য বললেও, যুদ্ধের অনিবার্যতা অনুভব করলেও তিনি আক্রান্ত হওয়ার আগ মুহূর্ত পর্যন্ত ধৈর্য ধারণ করেছেন। আক্রমণ করেননি। তিনি বিচ্ছিন্নতাবাদী আন্দোলনের নেতার দায় নিজ কাঁধে নেননি; ফলে বিশ্ববাসী তাঁকে স্বাধীনতাকামী জাতীয়তাবাদী নেতা হিসেবে বরণ করেছে। অন্যদিকে তিনি যে শান্তির পক্ষে তা প্রমাণে সমর্থ হয়েছেন।
আমি পূর্বেও বলেছি, জাতীয়তাবাদী নেতা হয়েও তিনি বিপ্লবী। দ্বিতীয় বিপ্লবের মাধ্যমে জনগণের মুক্তির লক্ষ্যে সমাজতান্ত্রিক বাংলাদেশ গঠনের উদ্যোগ নেন। তাঁর সে বিপ্লবও ছিল রক্তপাতহীন, শান্তি ও সৌহার্দের মাধ্যমে। সে সমাজতান্ত্রিক বিপ্লব ছিল সম্পূর্ণ তার চিন্তাধারার ফসল। তিনি বাংলাদেশের আর্থ-সামাজিক, রাজনীতিক এবং জাতীয়তাবাদী চেতনার বাস্তবতার আলোকে সে উপযোগী বিপ্লব সংঘটিত করতে চেয়েছিলেন।
বাংলাদেশ কৃষিপ্রধান দেশ। শিল্পোন্নত নয়। এ দেশে শিল্প-কারখানা কম, এদেশের অর্থনীতি কৃষি নির্ভর কাজেই তিনি বড় পরিবর্তন আনতে চেয়েছিলেন কৃষিখাতে। যে কারণে তিনি গ্রাম সমবায় চালু করেছিলেন এবং যৌথ কৃষি উৎপাদনের লক্ষ্য স্থির করেছিলেন। তাঁর সে বিপ্লব, সে পরিকল্পনা এবং চিন্তাধারা বাস্তবায়িত হলে ইতিহাস হয়ত অন্যভাবে লেখা হতো। তিনি বাংলাদেশে যে সমাজতন্ত্র প্রতিষ্ঠা করতে চেয়েছিলেন, যেভাবে চেয়েছিলেন তা তাঁর একান্ত নিজস্ব চিন্তাধারার ফসল। যা নিয়ে এখন পর্যন্ত যথাযথ আলোচনা হয়নি। মূল্যায়ন হয়নি। ফলে বঙ্গবন্ধুর জীবনের আন্দোলন-সংগ্রামের এবং বৈপ্লবিক কর্মকাণ্ডের বিশাল একটি অংশ অনালোচিত, অনালোকিত রয়ে গেল। আমরা তাঁর জীবনের এই অংশে যথেষ্ট আলো ফেলতে পাইনি বলে আজকের প্রজন্মের কাছে এই অধ্যায় অন্ধকারে রয়ে গেল।
বিশ্বের প্রথম সমাজতান্ত্রিক ফেডারেল রাষ্ট্র সোভিয়েত ইউনিয়ন ভেঙে গেছে বলে যেমন বলা যাবে না মার্ঙবাদ ব্যর্থ হয়েছে তেমনি বাকশাল বা বঙ্গবন্ধুর দ্বিতীয় বিপ্লব প্রতিষ্ঠিত হয়নি বলে বলা যাবে না বঙ্গবন্ধু বা তার চিন্তাধারা ব্যর্থ হয়েছে।
আসলে বঙ্গবন্ধুর বৈপ্লবিক পদক্ষেপ বা বিপ্লব শুরু করার কয়েক মাসের মধ্যে তাকে হত্যা করা হয়। এই হত্যাকাণ্ড প্রমাণ করে তাঁর পদক্ষেপ সঠিক ছিল। দেশের প্রতিবিপ্লবীরা, স্বাধীনতার পরাজিত শক্তি এবং সাম্রাজ্যবাদীর দালালরা অনুধাবন করতে পেরেছিল যে এই বিপ্লব সফল হলে তারা নিশ্চিহ্ন হবে বাংলার বুক থেকে। তাই তারা মরিয়া হয়ে উঠেছিল এবং বিপ্লবকে ব্যর্থ করার লক্ষ্যে বিপ্লবের মহানায়ককে খুন করেছিল।
২৫ জানুয়ারি ১৯৭৫ সালে জাতীয় সংসদে সংবিধানের চতুর্থ সংশোধনী পাস হওয়ার পর বঙ্গবন্ধু যে ভাষণ দেন তাতে তিনি প্রথমেই বলেন, ‘যখন শাসনতন্ত্র পাস করা হয় তখন আমিও হাউজের পক্ষ থেকে বলেছিলাম, এদেশের মানুষের অর্থনৈতিক মুক্তির জন্য, শোষণহীন সমাজ প্রতিষ্ঠার জন্য যদি দরকার হয় তবে এই সংবিধানেরও পরিবর্তন ও পরিবর্ধন করা হবে’। তিনি বলেন, ‘জনাব স্পিকার, আপনি জানেন যে, যুগ যুগ ধরে বাঙালি জাতি পরাধীন ছিল। দু’শো বছরের ইংরেজের শাসন, পঁচিশ বছরের পাকিস্তানি শাসন এবং শোষণ বাংলাকে সর্বস্বান্ত করে দিয়েছিল। পঁচিশ বছর পর্যন্ত আমরা সংগ্রাম করেছিলাম বাংলার মানুষকে মুক্তি দেওয়ার জন্য’।
তিনি বলেন, ‘এ জাতীয় বিপ্লবের পর দেখা গেছে অনেক দেশে লক্ষ লক্ষ লোক না খেয়ে মারা গেছে, অনেকে আশ্রয়হীন হয়ে রাস্তায় রাস্তায় ঘুরে বেরিয়েছে। আমরা চেষ্টা করেছি বন্ধুরাষ্ট্রের সাহায্যে আমাদের লোকজনকে পুনর্বাসিত করতে। কতটুক পেরেছি না পেরেছি জানি না। শুধু এতটুকু বলতে পারি আমাদের কর্তব্য পালন করতে ত্রুটি করি নাই’।
ইতিপূর্বে বিশ্বে সংঘটিত বিপ্লব ও স্বাধীনতা সংগ্রামের খবর যারা রাখেন তারা বঙ্গবন্ধুর উক্ত কথার মর্মার্থ এবং সত্যতা বুঝতে সক্ষম হবেন।
গত শতকের সত্তর দশকের শুরুতে বিশ্বজুড়ে খাদ্যাভাব ও মন্দা দেখা দিয়েছিল। যার প্রভাব পড়েছিল সদ্য স্বাধীন বাংলাদেশেও। সে ব্যাখ্যা দিতে গিয়ে বঙ্গবন্ধু তার ভাষণে বললেন, খাদ্য আমাদের কিনতে হয়। নইলে মানুষ না খেয়ে মারা যায়। আমরা যখন স্বাধীনতা পেলাম, তখন বাংলাদেশে এল খরা। তারপরে হলো দুনিয়াজোড়া ইনফ্লেশন। আগে যে জিনিস কিনতাম এক টাকা দিয়ে তা এখন আমাদের কিনতে হয় দুটাকা দিয়ে’।
দেশ আজ খাদ্যে স্বয়ংসম্পূর্ণ। তাঁর সুযোগ্য কন্যা শেখ হাসিনা রাষ্ট্রীয় ক্ষমতায় আসার পর কৃষিতে ভর্তুকি ও ঋণসুবিধা বৃদ্ধি করে দেশে খাদ্য উৎপাদন কয়েকগুণ বৃদ্ধি করেছেন। আজ জনসংখ্যা ৭৪ সালের তুলনায় আড়াইগুণ বেশি। তার পাশাপাশি কৃষি জমির পরিমাণ কমেছে প্রায় ৩৫ শতাংশ। তারপরও বাংলাদেশ ধান ছাড়াও অন্যান্য কৃষিপণ্য উৎপাদনে ঈর্ষণীয় সাফল্য অর্জন করেছে। বঙ্গবন্ধুর দ্বিতীয় বিপ্লব তথা গ্রাম সমবায় চালু ও সফল হলে এই সাফল্য অনেক আগেই অর্জিত হতো। সাধারণ মানুষের নেতা বঙ্গবন্ধু সেদিন জাতীয় সংসদে দাঁড়িয়ে আত্মসমালোচনা করে বলেন, ‘আপনি বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়েছেন, পাস করেছেন, আমি বিশ্ববিদ্যালয় পড়ে পাস করেছি। আমাদের এবং আজ যাঁরা লেখাপড়া শিখছেন তাদের লেখাপড়ার খরচ কে দেয়? আমাদের বাপ দাদা নয়, দেয় বাংলার দুখী জনগণ। কিন্তু আমরা তাদের কী ফেরত দিয়েছি? তাদের আমরা রি’পে করেছি কতটুকু? তাদের প্রতি কতটুকু কর্তব্য পালন করেছি। এ ব্যাপারে আজকে আমাদের আত্মসমালোচনার প্রয়োজন আছে। আজ একজনকে ডাক্তারি পাস করাতে বাংলার দুখী মানুষ না হলেও এক লক্ষ টাকা ব্যয় করে। একটা ইঞ্জিনিয়ার করতে না হলেও এক লক্ষ টাকা খরচ পড়ে। একজন এগ্রিকালচার এঙপার্ট করতে না হলেও এক লক্ষ টাকা খরচ পড়ে। এদেশের দুখী মানুষ, যাদের পেটে ভাত নাই তাদের অর্থেই এদের লেখাপড়া শেখানো হয়েছে’।
এত দ্ব্যর্থহীন কণ্ঠে জনগণের স্বার্থ নিয়ে এর আগে কেউ বলেছেন বলে মনে হয় না। স্বাধীনতার পর দেশ পরিচালনা করতে গিয়ে বঙ্গবন্ধুকে পদে পদে বিব্রত হতে হয়েছে। হয়রানি করেছে দুর্নীতি। সে প্রসঙ্গে তিনি সংসদে বলেন, ‘আজকে করাপশনের কথাও বলতে হয়। এই বাংলার মাটি থেকে করাপশন উৎখাত করতে হবে।
করাপশন আমার বাংলার কৃষক করে না, করাপশন আমার বাংলার মজদুর করে না। করাপশন করি আমরা। শিক্ষিত সমাজ, যারা তাদের টাকা দিয়ে লেখাপড়া করেছি’। এমন নির্জলা সত্য অকপটে যে নেতা বলতে পারেন তিনিই প্রকৃত নেতা, তিনিই জাতির ত্রাতা। জনসংখ্যা নিয়ে বলতে গিয়ে তিনি বলেছেন, আজ আমাদের পপুলেশন কন্ট্রোল করে উৎপাদন বৃদ্ধি করতে হবে। ভিক্ষুকের জাতের কোনো ইজ্জত আছে? দুনিয়ায় জীবনভর ভিক্ষা পাওয়া যায়? আমাদের স্বয়ংসম্পূর্ণ হতে হবে’।
চতুর্থ সংশোধনী প্রসঙ্গে তিনি বলেছেন, ‘আজকে অ্যামেন্ডেড কনস্টিটিউশনে যে নতুন সিস্টেমে আমরা যাচ্ছি তাও গণতন্ত্র। শোষিতের গণতন্ত্র। এখানে জনগণের ভোটাধিকার থাকবে। এখানে আমরা সমাজতন্ত্র করতে চাই। এখানে আমরা শোষিতের গণতন্ত্র রাখতে চাই। সাম্প্রদায়িকতার বীজ বাংলার মাটিতে আসতে পারবে না। আমরা তা হতে দেব না।
পূর্বে উল্লেখ করেছিলাম বঙ্গবন্ধু রক্তপাতহীন বিপ্লবের সূচনা করেছিলেন। তিনি ভাষণে তারও উল্লেখ করেছেন, রাতের বেলায় দু’জনকে মেরে বিপ্লব করা যায় না। আওয়ামী লীঘ বোধহয় এরকম কাজ দশ বছর-বিশ বছর আগে করতে পারত। কিন্তু দশটাকে মারলাম, পাঁচটাকে মারলাম তাতে বিপ্লব হয় না। এটা ডাকাতি হয়। ওটা খুনই হয়। ওটা মানুষের জীবনকে অতিষ্ঠ করা হয়। বাগেরহাটে একটা জায়গাতে চার ভাইয়ের মধ্যে তিনভাইকে রাতে এসে গুলি করে মেরে যায়। এটা কি একটা পলিটিক্যাল ফিলসফি? এ ফিলসফি দুনিয়ার পচা, দুর্গন্ধ ডাস্টবিনে নিক্ষিপ্ত হয়েছে’।
সে ঐতিহাসিক ভাষণ তিনি শেষ করেছিলেন এই বলে-‘কথা হলো এই যে, সবচেয়ে বড় কাজ আমাদের উই হ্যাভ টু ওয়ার্ক সিনসিয়ারলি অ্যান্ড আনেস্টলি ফর দি ইম্যানসিপেশন অব দি পুয়োর পিপল অব দি কান্ট্রি’।
বাঙালির অপর শ্রেষ্ঠ সন্তান কবিগুরু রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর। বাংলাভাষাকে সমৃদ্ধ করেছেন তাঁর অসাধারণ সৃষ্টিসম্ভার দিয়ে। তিনি বাংলা ও বাঙালিকে নিয়ে গিয়েছিলেন বিশ্বসভার সম্মানজনক আসনে। বাংলা শিল্প-সাহিত্য-সংস্কৃতির এমন কোনো শাখা নেই যেখানে তার সৃষ্টিশীলতার বিভা ছড়ায়নি। বাঙালির সকল আনন্দ ও দুঃখানুভূতির সহায় রবীন্দ্রনাথ। মূলত বাঙালির সকল সত্তা জুড়ে আছেন রবীন্দ্রনাথ। অন্যদিকে বাঙালির শ্রেষ্ঠ সন্তান বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান রাজনীতির কবি। জীবনজুড়ে এমন বিভা ছড়িয়ে গেছেন যার আলোয় বাঙালি শুধু নয় বিশ্বের সকল নিপীড়িত, নির্যাতিত মানুষ মুক্তির পথ খুঁজে নিতে পারে। প্রয়োজন শুধু বঙ্গবন্ধুকে অধিক জানা। তাঁর প্রতিটি পদক্ষেপ, সিদ্ধান্ত পরিকল্পনা থেকে শিক্ষা নেওয়া। দেশের এমন কোনো বিষয় নেই যে বিষয়ে বঙ্গবন্ধু ভাবেননি, বলেননি এবং উপায় বাৎলে দেননি।
মুজিব বর্ষে হাজার কোটি টাকা অপচয় করার আগে এ কথাগুলো যেন আমরা ভুলে না যাই।

সর্বশেষ সংবাদ