মুক্তির অন্বেষায় বঙ্গবন্ধুর দর্শন- কামরুল হাসান বাদল লেখক:কবি ও সাংবাদিক

পোস্ট করা হয়েছে 03/01/2020-02:15pm:    মানুষ ছাড়া পৃথিবীর অন্যান্য প্রাণিদের মুক্তির আকাঙ্ক্ষা আছে কি না থাকলেও তার কী রূপ, কী অনুভূতি ও ব্যথা তা জানবার সুযোগ আমাদের নেই। যখন থেকে প্রাণি হিসেবে মানুষ চিন্তা করার শক্তি অর্জন করেছে সম্ভবত তখন থেকেই তার ভেতর মুক্তির আকাঙ্ক্ষা তৈরি হয়েছে। ধারণা করতে পারি সেই গুহাবাসী মানুষ সেই পরিবেশ ও জীবন থেকে মুক্তি চেয়েছিল। মুক্তি চেয়েছিল বলেই পৃথিবী আজ জ্ঞান-বিজ্ঞানে এতটা অগ্রসর হতে পেরেছে। বিরূপ প্রকৃতির মাঝে বেঁচে থাকার তাগিদে প্রকৃতিকে জয় করার চেষ্টা করেছে। রোগ ব্যাধি থেকে বাঁচার জন্য ওষুধ ও চিকিৎসা পদ্ধতি আবিষ্কার করেছে। যে প্রাণিদের ভয়ে তটস্থ থাকতো মানুষ সে সব হিংস্র প্রাণিকে বশ করেছে। অর্থাৎ প্রাণি হিসেবে মানুষ নিজেদের শ্রেষ্ঠত্ব প্রতিষ্ঠা করেছে এই গ্রহে। সে তার প্রতিদ্বন্দ্বী হতে পারে এমন প্রাণিকে নিশ্চিহ্ন করেছে।
এই ক্ষেত্রে মুক্তি ঘটলেও মানুষ থেকে মানুষের মুক্তি এখনো ঘটাতে পারেনি মানুষ। যখন থেকে ব্যক্তিগত সম্পত্তির উদ্ভব হয়েছে তখন থেকেই শুরু হয়েছে দুর্বলের ওপর সবলের আধিপত্য, অত্যাচার ও অবিচার। আর একই সঙ্গে শুরু হয়েছে মানুষের মুক্তির চিন্তা এবং লড়াইটিও। এক সময় সবচেয়ে অসহায় প্রাণিটির নাম ছিল মানুষ। তার শারীরিক শক্তি তেমন বেশি ছিল না অন্যান্য বৃহৎ প্রাণিদের তুলনায়। শিকারের জন্য অন্য প্রাণিদের মতো দাঁত ও নখর ছিল না। ছিল শীত-তাপ-ঝড়-ঝঞ্ঝা-বৃষ্টি থেকে বাঁচার অবলম্বন। অন্যান্য প্রাণিদের শারীরিক গঠনই ছিল প্রকৃতির সঙ্গে মানানসই। তাদের কারো গায়ের মোটা চামড়া, চামড়ার ওপর পশম ইত্যাদি বিরূপ প্রকৃতি থেকে তাদের রক্ষা করতে পারত। মানুষের এমন ছিল না। ছিল না বলে ওই পরিস্থিতি থেকে মানুষ মুক্তির কথা ভেবেছে। যেহেতু তার শিকার করার ক্ষমতা ছিল না ফলে তাকে অন্য পন্থা আবিষ্কারের চেষ্টা করতে হয়েছে। আর সে তাড়না থেকেই মানুষ পাথর দিয়ে অস্ত্র তৈরি করেছে। আর আগুন আবিষ্কারের পর থেকেই মানুষ অন্য প্রাণিদের থেকে নিজেদের রক্ষা করার উপায় বের করার সঙ্গে সঙ্গে নিজেদের শ্রেষ্ঠত্ব প্রতিষ্ঠার উপায়ও বের করতে শিখেছে। গাছের পাতা-বাকল দিয়ে শীত ও তাপ থেকে নিজেদের রক্ষা করার উপায় বের করেছে। ওই যুগে মানুষের সম্পদ ছিল অভিন্ন। উদ্বৃত্ত সম্পদের ধারণা তখনও তাদের মধ্যে আসেনি। যেদিন থেকে এই ধারণা এসেছে সেদিন থেকে সবল, চতুর মানুষরাই ব্যক্তিগত সম্পদ বৃদ্ধির লক্ষে সমগোত্রীয় প্রাণি অর্থাৎ মানুষের ওপর (অবশ্যই তার চেয়ে দুর্বল) আধিপত্য বিস্তারের চেষ্টা শুরু করেছে। এভাবে যখন থেকে মানুষের শোষণ ও শাসনের শুরু তখন থেকেই বঞ্চিত, শোষিত মানুষদের মধ্যে মুক্তির আকাঙ্ক্ষাও শুরু। সম্ভবত তখন থেকেই কিংবা তার কিছুকাল পর থেকেই সমাজে দাসপ্রথারও শুরু। সে দাসপ্রথায় দাসেরা মানুষ হলেও তার মনিবের কাছে সে একটি প্রাণি ছাড়া অন্য কিছু ছিল না।
১৪৯২ সালে ব্রিটিশ নাগরিক কলম্বাস ভারত আবিষ্কারের আশায় জাহাজ নিয়ে বেরিয়ে ভুলক্রমে নোঙর করেছিলেন বর্তমান আমেরিকার বাহামা দ্বীপপুঞ্জে। এর ফলে ষোল শতাব্দি থেকে উত্তর ও দক্ষিণ আমেরিকার মতো দুটো বিশাল মহাদেশ পরিণত হয় ইউরোপের কলোনি হিসেবে। নিজেদের শ্রেষ্ঠত্ব বজায় রাখতে উপনিবেশকারীরা এই দুই উপমহাদেশের আদিবাসীদের প্রায় নিশ্চিহ্ন করে দিয়েছিল ব্যাপক গণহত্যার মাধ্যমে। এই গণহত্যা চালানো হয়েছিল নানা মাত্রা ও প্রক্রিয়ায়। নিজেদের দেশেই আদিবাসীদের দাসে পরিণত করা হয়েছিল বহিরাগতদের স্বার্থে। ব্যাপক গণহত্যার পর দুই আমেরিকায় দাস হিসেবে ব্যবহার করা আদিবাসীর সংখ্যা ছিল ৫৫ লাখ। এর বাইরেও সে সময় আফ্রিকা থেকে কৃষ্ণাঙ্গদের ক্রীতদাস হিসেবে নিয়ে আসা শুরু হয় আমেরিকায়। কয়েক শতাব্দি ধরে দুই আমেরিকায় নিয়ে আসা ক্রীতদাসের সংখ্যা দাঁড়িয়েছিল দু’কোটির মতো। ক্রীতদাসরা বাজারে বিক্রি হতো যে কোনো পশুর মতো। এসব তথ্য আমরা পাই ইতিহাস থেকে। তবে তা খুব বেশি দিনের পুরনো নয়। মাত্র ৫০০শ বছরের আগে যদি এমন ঘটনা বিদ্যমান ছিল বলে প্রমাণ পাই তাহলে তারও আগে কিংবা প্রগৈতিহাসিক যুগে মানুষের অবস্থা কী ছিল তা সহজে অনুমান করা যেতে পারে।
যে প্রক্রিয়ায় আমেরিকায় আদিবাসীদের সমূলে উচ্ছেদ ও বিনাস করা হয়েছিল আমেরিকা, অস্ট্রেলিয়ায়, যে রূপে মানুষকে ক্রীতদাস করে বিক্রি করা হতো, যে রূপে দাসদের গৃহপালিত পশুদের মতো বাঁচতে দেওয়া হতো সে পরিস্থিতি থেকে উত্তরণ কি এখনো ঘটেছে? সেই সাম্রাজ্যবাদী শক্তি, সেই পুঁজিবাদী শ্রেণি এখনো কি মানুষকে দাস বানিয়ে রাখছে না? এখনো কি মানুষকে পণ্য হিসেবে বিক্রি করছে না? করছে, তবে তার ধরনটি পাল্টেছে। পুঁজিবাদী ব্যবস্থায় এখনো যে কোনো কিছুই পণ্য। এমন কি মানুষও। শাসন-শোষণ এবং বিভিন্ন রীতি-নীতির শেকলে মানুষ এখনো কি শেকলবন্দি নয়? লেখার একটি অংশে উল্লেখ করেছিলাম, চতুর, ধূর্ত ও সবলরা কীভাবে ব্যক্তিগত সম্পদ বৃদ্ধি করেছিল এবং উদ্বৃত্ত সম্পদ করায়ত্ব করেছিল। তারই ধারাবাহিকতায় এশিয়া আফ্রিকায় গড়ে উঠেছিল ইউরোপীয় উপনিবেশ। যা মূলত বনিক পুঁজির বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি নির্ভর আগ্রাসন। আজ বিশ্ব হতে উপনিবেশ প্রায় শেষ হতে চললেও বিজ্ঞান ও প্রযুক্তিনির্ভর উপনিবেশ আজও বিদ্যমান। ছোট ও দুর্বল দেশগুলো ধনিক শ্রেণির বৃহৎ ও উন্নত রাষ্ট্রের ইচ্ছার পুতুলে পরিণত হয়েছে। আমাদের বাংলাদেশও এর বাইরে নয়।
২। গত শতকে বিশ্ব ছিল মূলত দু’ধারায় বিভক্ত। একদিকে সাম্রাজ্যবাদী আমেরিকাসহ পুঁজিবাদী দেশগুলোর জোট ন্যাটো অন্যদিকে সমাজতান্ত্রিক ফেডারেল রাষ্ট্র তৎকালীন সোভিয়েত ইউনিয়নের সমর্থিত সমাজতান্ত্রিক রাষ্ট্রগুলোর জোট ওয়ারশ জোট! এর বাইরে জোট নিরপেক্ষ একটি আন্দোলন গড়ে উঠেছিল বিশ্বে তখন। এই শক্তিটি সরাসরি ওয়ারশভুক্ত না হলেও জোট নিরপেক্ষ দেশগুলোর অবস্থান ছিল অবাধ পুঁজিবাদ বিরোধী।
দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর ঔপনিবেশিক শাসন ব্যবস্থা ভেঙে যেতে লাগল। পরাজয় হলো ফ্যাসিবাদের এবং বিশ্বের নানা পরাধীন দেশ স্বাধীনতা লাভ করতে লাগল। একই সঙ্গে বিশ্ব বিভক্ত হয়ে গেল দুটো শিবিরে। একটি পুঁজিবাদী অন্যটি সমাজতান্ত্রিক অর্থব্যবস্থায় বিশ্বাসী। এই দুই মেরুর নেতৃত্বে দুটো পরাশক্তি। একটি আমেরিকা এবং তার সমর্থিত ন্যাটো জোট। অন্যটি সোভিয়েত ইউনিয়ন সমর্থিত ওয়ারশ জোট। এই দুই পরাশক্তির মাঝখানে সদ্য স্বাধীন এবং দুর্বল ও অনুন্নত রাষ্ট্রগুলো মিলে গঠন করে জোট নিরপেক্ষ আন্দোলন বা ন্যাম। তৃতীয় বিশ্বের সেসব দেশ তখনো স্বাধীনতার জন্য লড়াই করে যাচ্ছিল তাদের প্রতি প্রথম থেকেই সমর্থন ব্যক্ত করে জোট নিরপেক্ষ আন্দোলন। ফলে গত শতকের ৮০’র দশকের মধ্যেই এশিয়া ও আফ্রিকার অধিকাংশ দেশ জোট নিরপেক্ষ আন্দোলনে যুক্ত হয়। স্বাধীনতার পরপরই বঙ্গবন্ধু বাংলাদেশকে এই জোটে যুক্ত করেন। এবং খুব কম সময়ের মধ্যে জোটের গুরুত্বপূর্ণ নেতায় পরিণত হন। ৯০’ দশকের শুরুতে সোভিয়েত ইউনিয়ন ভেঙে গিয়ে বিশ্ব এক কেন্দ্রিক আধিপত্যবাদী আমেরিকার হাতে না পড়লে এবং ৯০ দশক পর্যন্ত বঙ্গবন্ধু বেঁচে থাকলে জোট নিরপেক্ষ আন্দোলনেরও অবিসৎবাদিত নেতা হতেন বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান। মিসরের প্রেসিডেন্ট গামাল আবদুল নাসের, যুগোস্লোভিয়ার কমিউনিস্ট আন্দোলনের নেতা জোসেফ টিটো, ভারতের প্রধানমন্ত্রী জওহরলাল নেহেরু, ঘানার কাওয়ামে ক্রুসাহ এবং ইন্দোনেশিয়ার রাষ্ট্রপতি আহমদ সুকর্ণের সাথে বঙ্গবন্ধুর নামও একই মর্যাদায় উচ্চারিত হতো। এঁদের মধ্যে মিসরের আবদুল নাসের, ইন্দোনেশিয়ার প্রেসিডেন্ট আহমদ সুকর্ণ বঙ্গবন্ধুর মতো মার্কিন সাম্রাজ্যবাদের চক্রান্তে নিহত হন।
৩। আমি মনে করি বঙ্গবন্ধু মানবমুক্তির যে সংগ্রাম দেখেছিলেন এবং মুক্তিযুদ্ধের আহ্বান করেছিলেন তার অংশ হিসেবে তাঁর দ্বিতীয় বিপ্লব বাকশাল প্রতিষ্ঠা করেছিলেন। তার আগে তিনি সংবিধানে যুক্ত করেছিলেন চার মূলনীতি, যা থেকে এই রাষ্ট্রের বিযুক্ত হওয়া বা বিচ্যুত হওয়া সম্ভব নয়। আমি ভীষণ বিস্ময়ের সঙ্গে লক্ষ্য করি বাকশাল প্রসঙ্গ এলে আওয়ামী লীগের অনেক জাঁদরেল নেতারও মুখ শুকিয়ে যায়। তাঁদেরকে প্রতিপক্ষ যখন বাকশালী হিসেবে ঘায়েল করার চেষ্টা করে তখন তারা তার সঠিক প্রতি উত্তর দিতে পারে না। বাকশাল যে অপশক্তির স্বার্থহানি করেছিল, যে শক্তির উত্থানের পথ রুদ্ধ করেছিল তারা খুব কৌশলে ‘বাকশাল’কে একটি গালিতে পরিণত করেছিল। দুর্ভাগ্য হচ্ছে আওয়ামী লীগ পরবর্তীতে বাকশাল কর্মসূচি থেকে সরে এলেও বঙ্গবন্ধুর এই মহৎ কর্মসূচির সঠিক ব্যাখ্যা তুলে ধরতে পারেনি। প্রমাণ করে দিতে পারেনি। বঙ্গবন্ধু বাকশাল করে ভুল করেননি। অনেক সুশীল বলে থাকেন, বাকশাল বঙ্গবন্ধুর রাজনৈতিক ভুল পদক্ষেপ। এ বক্তব্য যে ভুল তা প্রমাণের চেষ্টা আওয়ামী লীগ এবং তার অনুসারী লেখক গবেষক ও রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা করেননি।
বাকশালের দুটো সিদ্ধান্ত সমালোচকদের ভাষায় ‘এক দলীয় গণতন্ত্র’ এবং ‘সংবাদ মাধ্যম’ নিয়ন্ত্রণ’ নিয়েই নিন্দুক ও বিরোধীরা আওয়াজ তোলেন বেশি কিন্তু এর যে সামাজিক, সাংস্কৃতিক, অর্থনৈতিক, দার্শনিক এবং শোষিতের পক্ষে রাজনৈতিক গুরুত্ব আছে তা এরা বোঝার চেষ্টা করেনি অথবা বুঝলেও নিজ স্বার্থের খাতিরে তা এড়িয়ে গেছেন। তবে আবারও বলি, এটি বেশি বোঝার দায়িত্ব যাদের তারা অর্থাৎ আওয়ামী লীগ ও তার অনুসারী সংগঠনগুলো অনুধাবনের চেষ্টা করেনি। বঙ্গবন্ধু বলেছিলেন “পৃথিবী আজ দু’ভাগে বিভক্ত। শোষক ও শোষিত; আমি শোষিতের পক্ষে।” বঙ্গবন্ধু দেশে শোষিতের গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠা করতে চেয়েছিলেন। জনগণের একটি সার্বভৌম রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠা করতে চেয়েছিলেন। সব ধর্ম, সব বর্ণ ও সব লিঙ্গের একটি সভ্য রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠা করতে চেয়েছিলেন। রাষ্ট্রকে যদি আজ সব মানুষের করে গড়ে তুলতে চাই দেশকে দুর্নীতি, অসততা, সাম্প্রদায়িকতা, অমানবিকতা, অসভ্যতা থেকে মুক্ত করতে চাই, সকল শোষণ বঞ্চনার অবসান চাই তাহলে বঙ্গবন্ধুর মুক্তির সংগ্রাম ছাড়া উপায় নেই। মুক্তির অন্বেষায় তাঁর দর্শন ধারণ করা ছাড়া উপায় নেই ।
লেখক:কবি ও সাংবাদিক Kamrul Hassan Badal

সর্বশেষ সংবাদ