মজুতদার, সিন্ডিকেট এবং নিউটনের তৃতীয় সূত্র- কামরুল হাসান বাদল কবিও সাংবাদিক

পোস্ট করা হয়েছে 21/11/2019-10:02am:    ১। সদ্য স্বাধীন দেশ। আমার তখন কিশোরকাল। দেয়ালে হাতে লেখা পোস্টারের একটি স্লোগান খুব মনোযোগ কাড়তো। তাতে লেখা, কালোবাজারি-মজুতদার হুঁশিয়ার-সাবধান। কালোবাজারির অর্থ সে সময় বুঝতাম না। মজুতদারের অর্থও বুঝতাম না। বড়দের কাছে জানতে চাইলে তারা বুঝিয়ে বলতেন। এখন অবশ্য কালোবাজারি কী আর মজুতদাররা কী কী করতে পারেন তা হাড়ে হাড়ে টের পাচ্ছি। মজুত করা খারাপ কিছু নয়। প্রতিটি পরিবারই কোনো না কোনো কিছু মজুত করে। সামান্য কৃষক সারাবছরের খাদ্য ধান গোলায় মজুত করে। শুষ্ক অনেক খাদ্যও মজুত করে রাখা হয়। সরকারও অনেক ধরনের খাদ্য মজুত করে রাখে আপদকালীন প্রয়োজনে। অনেক ব্যবসায়ীও পণ্য মজুত করেন। মৌসুমের সময় সস্তায় কিনে মজুত করেন পরে তা বেশি দামে বিক্রি করার লক্ষ্যে। এমন মজুত নিয়ে কোনো আপত্তি নেই। এটিই নিয়ম। মজুত কখন ক্ষতিকর হয়-তা বিশদ ব্যাখ্যা করা বাংলাদেশের পাঠকদের জন্য প্রয়োজন বলে মনে করি না। বিশেষ করে এই সময়ে, যখন আমরা সবাই পেঁয়াজ নিয়ে মহা বিড়ম্বনায় আছি। মজুত যখন কোনো সরকার পতনের হাতিয়ার হয়ে ওঠে, মজুত যখন মানুষকে জিম্মি করে রাতারাতি কোটিপতি হওয়ার লক্ষ্য হয়ে ওঠে তখন মজুত আইনত অপরাধ এবং মজুতদার অপরাধী হিসেবে সমাজ ও রাষ্ট্রে চিহ্নিত হয়। আজকাল ‘সিন্ডিকেট’ শব্দটির বেশ প্রচলন হয়েছে। এই সিন্ডিকেটের মাধ্যমেই চাঁদাবাজি, টেন্ডারবাজি, কালোবাজারি, মজুতদারি ইত্যাদি হচ্ছে। এইসব সিন্ডিকেটে অনেক সময় মন্ত্রী-এমপি, সরকারি দলের প্রভাবশালী নেতা, সরকারি বড় কর্মকর্তা, আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর অনেকে জড়িত থাকেন বলে শোনা যায়। ফলে এ ধরনের সিন্ডিকেটের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়াও কঠিন হয়ে পড়ে সরকারের। এরা অধিক ক্ষমতাশালী হলে এবং তাদের স্বার্থহানির আশঙ্কা দেখলে অনেক সময় সরকার পতনের মতো পরিস্থিতিও তৈরি করতে পারে। এই মুল্লুকে এর নজির আছে। বঙ্গবন্ধু তাঁর ‘অসমাপ্ত আত্মজীবনী’ গ্রন্থে এমন একটি ঘটনার বর্ণনা দিয়েছেন। সময়টি তখন দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের শেষের দিকে। অবিভক্ত বাংলায় তখন মুসলিম লীগের প্রাদেশিক সরকার। খাজা নাজিমউদ্দিন মুখ্যমন্ত্রী। হোসেন শহীদ সোহরাওয়ার্দি সিভিল সাপ্লাই মন্ত্রী। মুসলমানদের জন্য আলাদা রাষ্ট্র পাকিস্তান প্রায় প্রতিষ্ঠার পথে। সে সময়ের কথা বঙ্গবন্ধু লিখেছেন, ‘এই সময় বাংলায় মুসলিম লীগ সরকারের পতন হয়। গভর্নর শাসনক্ষমতা নিজের হাতে নেন। শহীদ সাহেব দেখলেন যুদ্ধের সময় অধিক লাভের আশায় ব্যবসায়ীরা কালোবাজারে কাপড় বিক্রি করার জন্য গুদামজাত করতে শুরু করেছে। একদিকে খাদ্য সমস্যা ভয়াবহ। শহীদ সাহেব রাতদিন পরিশ্রম করছেন। আর অন্যদিকে অসাধু ব্যবসায়ীরা জনগণের জীবন নিয়ে ছিনিমিনি খেলতে শুরু করেছে। শহীদ সাহেব সমস্ত কর্মচারীদের হুকুম দিলেন, মাড়োয়ারি ব্যবসায়ীদের আড্ডাখানা বড়বাজার ঘেরাও করতে। সমস্ত বড়বাজার ঘেরাও করা হলো। হাজার হাজার গজ কাপড় ধরা পড়ল। এমনকি দালানগুলোর নিচেও এক একটা গুদাম করে রেখেছিল তাও বাদ গেল না। এমনি করে সমস্ত শহরে চাউল গুদামজাতকারীদের ধরবার জন্য একইভাবে তল্লাশি শুরু করলেন। মাড়োয়ারিরাও কম পাত্র ছিল না। কয়েক লক্ষ টাকা তুলে লীগ মন্ত্রিসভাকে খতম করার জন্য কয়েকজন এমএলএকে কিনে ফেলল। ফলে এক ভোটে লীগ মন্ত্রিত্বকে পরাজয় বরণ করতে হল। যদিও এটা অনাস্থা প্রস্তাব ছিল না। খাজা নাজিমউদ্দিন সাহেব চ্যালেঞ্জ দিলেন এই কথা বলে যে, আগামীকাল আমি আস্থা ভোট নেব। যদি আস্থা ভোট না পাই তবে পদত্যাগ করব। স্পিকার ছিলেন নওশের আলী সাহেব। পরের দিন তিনি রুলিং দিলেন, মন্ত্রীদের বিরুদ্ধে অনাস্থা প্রস্তাব পাশ হয়ে গেছে। আস্থা ভোটের দরকার নাই’।
‘আমি কিছু সংখ্যক ছাত্র নিয়ে সেখানে উপস্থিত ছিলাম। খবর যখন রটে গেল লীগ মন্ত্রিত্ব নেই তখন দেখি টুপি ও পাগড়িপরা মাড়োয়ারিরা বাজি পোড়াতে শুরু করেছে এবং হৈ চৈ আরম্ভ করেছে। সহ্য করতে না পেরে আরও অনেক কর্মী ছিল, মাড়োয়ারিদের খুব মারপিট করলাম। ওরা ভাগতে শুরু করল।’
বঙ্গবন্ধুর ‘অসমাপ্ত আত্মজীবনী’ বই থেকে এই অংশটুকু উদ্ধৃতি দিলাম কয়েকটি কারণ বোঝাতে। প্রথমত মজুতদারদের সিন্ডিকেট কতটা শক্তিশালী হয়ে উঠতে পারে এবং নিজেদের স্বার্থরক্ষার খাতিরে কীভাবে সরকারের পতন ঘটাতে পারে তার নজির তুলে ধরতে। দ্বিতীয়ত হচ্ছে, এ ধরনের সিন্ডিকেটের সঙ্গে রাজনৈতিক ব্যক্তিদের সংশ্লিষ্টতা কীভাবে হয় তা বোঝাতে। সেসময় প্রাদেশিক সরকারের পতনের জন্য মাড়োয়ারি মজুতদার সিন্ডিকেট এমএলএদের (মেম্বার অব লোয়ার অ্যাসেম্বলি বা প্রাদেশিক গণপরিষদের সদস্য) টাকা দিয়ে কিনে নেয় এবং এমএলএরা নিজ দলের বিপক্ষে ভোট দিয়ে সরকারের পতন ঘটায়। বঙ্গবন্ধু ছিলেন বিচক্ষণ ও দূরদর্শি রাজনীতিক। এ ধরনের ঘটনা থেকেই তিনি অভিজ্ঞতা সঞ্চার করেছিলেন। যেমন, স্বাধীনতার পর সংবিধান প্রণয়নের সময় তিনি একটি বিষয়ে খুব সতর্ক ছিলেন। কারণ তিনি এদেশের রাজনীতিবিদদের খুব ভালো করেই চিনতেন। আমি যে বই এবং যে অংশ থেকে উদ্ধৃতি দিয়েছি সেখানেই তাঁর সে তিক্ত অভিজ্ঞতার বয়ান আছে, এদেশের নির্বাচিত জনপ্রতিনিধিরা কীভাবে টাকার কাছে বেচাকেনা হয়ে যেতেন। সে ধরনের পরিস্থিতি পরবর্তীতে পাকিস্তান আমলেও ঘটেছিল। সে তিক্ত অভিজ্ঞতা থেকেই বঙ্গবন্ধু সংবিধানে ৭০ অনুচ্ছেদ সংযোজন করেছিলেন। যাতে সংসদ সদস্যরা সংসদে দলের বিরুদ্ধে ভোট দিতে না পারে। ৭০ অনুচ্ছেদ নিয়ে রাজনৈতিক সুশীল সমাজে বিতর্ক থাকলেও বাংলাদেশের বাস্তবতায় তার প্রয়োজন আছে বলে আমি এখনো মনে করি।
সে তিক্ত অভিজ্ঞতা থেকেই তিনি স্বাধীনতার পর দেশে বেশকিছু গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ গ্রহণ করেছিলেন। এরমধ্যে ট্রেডিং করপোরেশন অব বাংলাদেশ (টিসিবি), ন্যায্যমূল্যের দোকান কসকর, বিআরটিসি অন্যতম। তিনি ব্যবসা-বাণিজ্যের ক্ষেত্রে ব্যবসায়ীদের একচেটিয়া ক্ষমতা খর্ব করতেই টিসিবি গঠন করেছিলেন। যে প্রতিষ্ঠানের অন্যতম কাজ হলো প্রয়োজনে পণ্য আমদানি করে বাজারে পণ্যের চাহিদা স্থিতিশীল রাখা। ব্যবসায়ী, সিন্ডিকেট, আমদানিকারক, আড়তদারদের কারসাজিতে বাজারে কোনো পণ্যের কৃত্রিম সংকট তৈরি হলে টিসিবির মাধ্যমে সরকার যেন পরিস্থিতি সামাল দিতে পারে সে লক্ষ্যে বঙ্গবন্ধু টিসিবি গঠন করেছিলেন। যুদ্ধবিধ্বস্ত দেশে নানা প্রকার অব্যবস্থাপনা থাকে। পণ্যের ঘাটতি থাকে। অভাব ও দারিদ্র্য থাকে। তাই ন্যায্যমূল্যে সাধারণ মানুষ যেন পণ্য ক্রয় করতে পারে সে লক্ষ্যে তিনি ন্যায্যমূল্যের দোকান ‘কসকর’ প্রতিষ্ঠা করেছিলেন। পেঁয়াজ সংকটে পড়ে বারবার বঙ্গবন্ধু এবং তার সিদ্ধান্তগুলোর কথা মনে পড়ছে। মনে হয় তিনি ত্রিকালদর্শী ছিলেন।
পুঁজির ইতিহাস মূলত লুণ্ঠনের ইতিহাস। একচেটিয়া পুঁজির পথ রুদ্ধ করতেই বঙ্গবন্ধু সমাজতান্ত্রিক অর্থনৈতিক ব্যবস্থার প্রচলন করেছিলেন। তাতে স্বার্থহানি ঘটেছিল বাঙালি নব্য পুঁজিপতিদের। তার দাম বঙ্গবন্ধুকে প্রাণ দিয়ে পরিশোধ করতে হয়েছিল। স্বাধীনতার পর রাষ্ট্রনায়ক হিসেবে বঙ্গবন্ধু যত ভাষণ দিয়েছেন তার অধিকাংশের বক্তব্যই ছিল অসাধু ব্যবসায়ী, আমলা আর দুর্নীতিবাজদের বিরুদ্ধে। চল্লিশ দশকের মধ্যভাগে ছাত্রাবস্থায় তিনি যে মজুতদারদের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ করেছিলেন, তাদের প্রতিরোধ করেছিলেন সে মজুতদার শ্রেণির চক্রান্তের শিকার তিনি দেশ স্বাধীন করে, তা পরিচালনা করতে গিয়েও হয়েছিলেন। এখন তার কন্যা শেখ হাসিনাকেও দেশ পরিচালনা করতে গিয়ে একই শক্তির সঙ্গে মোকাবেলা করতে হচ্ছে।
২। পেঁয়াজ নিয়ে বর্তমান সরকার একটি বড় ধাক্কা খেয়েছে বলা যায়। অতীতের তিক্ত অভিজ্ঞতার কারণেই আওয়ামী লীগ সরকার বারবারই ভোগ্যপণ্য সরবরাহ ও বাজার মূল্য নিয়ন্ত্রণে সবসময় সতর্ক ছিল। যে কারণে আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে বাজার পরিস্থিতি খুব বেশি খারাপ পর্যায়ে যায়নি। এমনকি ২০১৪ সালের বিএনপি ঘোষিত লাগাতার হরতাল-অবরোধ এবং চরম পেট্রোল বোমাবাজির সময়েও দেশের কোথাও পণ্য সরবরাহে ঘাটতি হতে দেয়নি। দাম বৃদ্ধি করার সুযোগ পায়নি ব্যবসায়ীরা। তবে কয়েক বছর পরপর পেঁয়াজ নিয়ে এমন ঘটনা ঘটেই চলেছে। কাজেই এ বিষয়ে আগে থেকে বা শুরু থেকেই বাণিজ্য মন্ত্রণালয়কে সতর্ক হওয়া প্রয়োজন ছিল।
পেঁয়াজ যেহেতু একটি পচনশীল পণ্য কাজেই এটি বেশিদিন মজুত করে রাখাও সম্ভব নয়। অন্যদিকে চাহিদার ৪০ থেকে ৫০ শতাংশ পেঁয়াজ যেহেতু আমদানি করতে হয় সেহেতু আমদানির জন্য শুধু ভারতের ওপর নির্ভরশীল না থেকে রফতানিকারক অন্য দেশের খোঁজ রাখা দরকার। এবং সে সাথে দেশে অভ্যন্তরীণ উৎপাদন, সংরক্ষণ ও বিপণন ব্যবস্থা গড়ে তোলা দরকার ছিল। ভারত থেকে গরু আমদানি এক প্রকার বন্ধ হয়ে যাওয়ার পর দেশে গরু বা গবাদিপশু উৎপাদন বৃদ্ধি পেয়েছে। কোরবান ঈদের মতো বড় চাহিদার যোগান এখন দেশের খামারিরাই দিচ্ছে গত দু-তিন বছর ধরে। বাংলাদেশ ইতিমধ্যে মিঠাপানির মাছ, সবজি, ফল ইত্যাদি উৎপাদনে ব্যাপক সাফল্য অর্জন করেছে। কাজেই উন্নতমানের জাত, কৃষকদের প্রয়োজনীয় সহায়তা এবং উৎপাদনের পর সংরক্ষণের আধুনিক ব্যবস্থা গড়ে তুলতে পারলে চাহিদার পুরোটাই পেঁয়াজ উৎপাদন করা সম্ভব বাংলাদেশে। তবে পেঁয়াজের জন্য আলাদা কোল্ড স্টোরেজের প্রয়োজন। আলুর সঙ্গে তা রাখা যাবে না। পেঁয়াজ সংরক্ষণের জন্য কোল্ড স্টোরেজে আর্দ্রতা লাগবে ৬০%। তাপমাত্রা লাগবে ৮ থেকে ১২ ডিগ্রি। আলুর ক্ষেত্রে এই মাত্রাটা ভিন্ন থাকে। তবে প্রাথমিক অবস্থায় আলুর স্টোরেজের কিছু কিছু অংশকে এই ব্যবস্থায় এনে পেঁয়াজ সংরক্ষণের ব্যবস্থা করা যেতে পারে। তবে এর সঙ্গে বাণিজ্য মন্ত্রণালয়, কৃষি মন্ত্রণালয়ের মধ্যে সমন্বয় ও বোঝাপড়ারও দরকার আছে। দেশের উৎপাদক তথা কৃষকদের স্বার্থ রক্ষার বিষয়েও সরকারের নজরদারি দরকার। দেশের উৎপাদিত পেঁয়াজের বা যে কোনো পণ্যের বাজার নিশ্চিত করার জন্য কোন সময়ে সে পণ্যের আমদানি সচল থাকবে, কোন সময়ে সাময়িক বন্ধ থাকবে, কোন সময়ে আমদানি শুল্ক বেশি থাকবে, কোন সময়ে আমদানি শুল্ক তুলে দিয়ে বাজারে সরবরাহ বাড়াতে হবে সেদিকে তীক্ষ্ণ নজর রাখতে হবে এবং আমলাতান্ত্রিক জটিলতা পরিহার করে দ্রুত সিদ্ধান্ত নিতে হবে। যেমন বর্তমানে সরকার পেঁয়াজের আমদানি শুল্ক তুলে নিয়েছে। যে কোনোভাবে সরকার দেশে পেঁয়াজ আমদানি করে পরিস্থিতি সামাল দিতে চাইছে। মনে রাখতে হবে এক থেকে দেড় মাসের মধ্যে আমাদের দেশি পেঁয়াজ বাজারে আসবে। সে সময় শুল্কমুক্ত পেঁয়াজের কাছে দেশি পেঁয়াজ যেন বাজার না হারায়, কৃষকরা যেন ক্ষতিগ্রস্ত না হয় সেদিকেও লক্ষ্য রাখতে হবে।
অনেক সময় কাগজে কলমে হিসাব ঠিক থাকলেও বাস্তবতা ভিন্ন হতে পারে। বিভিন্ন সূত্র থেকে পাওয়া তথ্যে জানা যায় দেশে ২৪ লাখ মেট্রিক টন পেঁয়াজের চাহিদা আছে। এরমধ্যে ১৪ থেকে ১৬ হাজার মেট্রিক টন দেশে উৎপাদিত হয়। বাকিটুকু আমদানি করতে হয়। ধরে নিলাম বাণিজ্য মন্ত্রণালয় হিসাবটি ঠিক রেখেছে। অর্থাৎ তারা হিসাব করে তথ্য যাচাই করে দেখেন যে, উৎপাদিত পেঁয়াজের সঙ্গে আর কত পরিমাণ আমদানি করতে হবে। হয়ত দেখা গেল যে আমদানির পরিমাণও ঠিক আছে। অর্থাৎ চাহিদার সমান পেঁয়াজ দেশে মজুত আছে। কিন্তু বাস্তবে এমন সুস্থ পরিস্থিতি নাও থাকতে পারে। কারণ ব্যবসায়ীদের অসাধুতা বা অতি মুনাফার লক্ষ্য। যেমন ধরুন, আমার কাছে পেঁয়াজ আছে ৫ কেজি। আমি তা ২৫ টাকা ধরে বিক্রি করলে পাব ১২৫ টাকা। প্রতি কেজিতে ৫ টাকা করে ধরলে লাভ হবে ২৫ টাকা। এখন আমি সে ৫ কেজি পেঁয়াজের মধ্যে তিন কেজি পচিয়ে ফেললাম বা ফেলে দিলাম কর্ণফুলীতে। বাকি দু কেজি বিক্রি করলাম ২০০ টাকা দরে। এখন কত পার্সেন্ট লাভ হলো। অসাধু ব্যবসায়ীরা সিন্ডিকেটের মাধ্যমে এই অপকর্মটি করতে পারে এবং রাতারাতি কয়েক হাজার কোটি টাকার মালিক হয়ে যেতে পারে। অতীতে এভাবেই অনেকে রাতারাতি কোটিপতি হয়েছেন। এবং ভবিষ্যতেও হবেন।
সবসময় পুলিশ, ভ্রাম্যমাণ আদালত ইত্যাদি দিয়ে বাজার নিয়ন্ত্রণ করা যায় না। তার নজির ১/১১ সরকারের সময়ে অস্থিতিশীল চালের বাজারের চিত্র থেকে বুঝেছি। এবার পেঁয়াজের বেলায়ও দেখেছি। বিষয়টি অনেকটা নির্ভর করে ব্যবসায়ীদের আন্তরিকতা ও ব্যবসায়িক সততার ওপর। বিশ্বে খাদ্যপণ্য ও ওষুধের ব্যবসা যারা করেন তারা ন্যূনতম একটি নীতি মান্য করেন। দুঃখজনক হলেও সত্যি যে, বাংলাদেশে ৯২ শতাংশ ঈমানদার ও প্রবল ধর্মীয় অনুভূতিসম্পন্ন মুসলমানের দেশে তার বিন্দুমাত্র বালাই নেই।
পুনশ্চ- পরিবহন আইন কার্যকর করার পরদিনই দেশের অনেক জেলায় পরিবহন মালিক-শ্রমিকরা ধর্মঘট পালন করছে। তাতে বিপাকে পড়েছে সাধারণ যাত্রীরা। এটি তাদের পুরোনো কৌশল। তবে এবার সরকারকে আইন প্রয়োগ ও তা মানায় বাধ্য করতে হবে। কয়েক লাখ পরিবহন শ্রমিকের গোয়ার্তুমির কাছে ১৬ কোটি মানুষ জিম্মি হয়ে থাকতে পারে না। প্রথমদিন থেকেই আইনটির কঠোর প্রয়োগ বাঞ্ছনীয় ছিল। কিন্তু দেশের যোগাযোগ মন্ত্রী এক সপ্তাহের জন্য আইনটি শিথিল করেছিলেন। আইন প্রণীত হয়ে কার্যকর করার পর তা শিথিল করার এখতিয়ার করো আছে কি না সে প্রশ্ন রেখে বলতে চাই, সড়ক যোগাযোগ ব্যবস্থাপনায় শৃঙ্খলা আনতে হলে আইনটি কঠোরভাবে প্রয়োগ করতে হবে। এ প্রসঙ্গে আবারও জাতির পিতা বঙ্গবন্ধুর কথা বলতে হয়। ব্যবসায়ীদের একচেটিয়া আধিপত্য বা মনোপলিনেস খর্ব করতে তিনি যেভাবে টিসিবি গঠন করেছিলেন সেভাবে গড়ে তুলেছিলেন বিআরটিসি। দুর্নীতি, অব্যবস্থাপনা, অবহেলা আর বেসরকারি বাস মালিকপক্ষের চক্রান্তে প্রতিষ্ঠানটিকে রুগ্ন করে ফেলা হয়েছে। এটি সক্রিয় ও সক্ষম থাকলে সড়ক পরিবহন সেক্টরে মাস্তানি, চাঁদাবাজদের দৌরাত্ম্য অনেক কমে যেত।
বিজ্ঞানী নিউটনকে স্মরণ করে লেখাটি শেষ করছি। নিউটনের তৃতীয় সূত্র মতে, ‘প্রত্যেক ক্রিয়ারই সমান ও বিপরীত প্রতিক্রিয়া রয়েছে’। শেখ হাসিনার শুদ্ধি অভিযান একটি ক্রিয়া। কাজেই তার সমান ও বিপরীত প্রতিক্রিয়া সমাজে দৃশ্যমান হয়ে উঠবে। জাতিকে, (যারা দুর্নীতিমুক্ত বাংলাদেশ চান) এর জন্য প্রস্তুত থাকতে হবে। পেঁয়াজের পর এবার লবণ নিয়ে খেলা শুরু হয়েছে। লেখক : কবি ও সাংবাদিক

সর্বশেষ সংবাদ