পার্বত্য চট্টগ্রামের পাহাড়ি বর্ণাঢ্য জলকেলি বৈসাবি উৎসব

পোস্ট করা হয়েছে 13/04/2019-10:10am:    বৈসাবি উৎসবকে ঘিরে মেতেছেন পার্বত্য চট্টগ্রামের পাহাড়ি জনপদের চার সম্প্রদায়ের লোকজন।বর্ণাঢ্য আয়োজনের মধ্য দিয়ে শুরু হল পাহাড়িদের বর্ষবরণ উৎসব নতুন বাংলা বছরকে বরণ ও পুরাতন বছরকে বিদায়ের উৎসবকে তারা ভিন্ন নামে পালন করে আসছেন বহুকাল ধরে। মারমা ভাষায় সাংগ্রাই, ত্রিপুরা ভাষায় বৈসু, তঞ্চঙ্গ্যা ভাষায় বিষু এবং চাকমাদের ভাষায় বিজু’র সংক্ষেপিত রূপ হচ্ছে বৈসাবি। পার্বত্য চট্টগ্রামের পাহাড়ি জনগোষ্ঠীর এ চার সম্প্রদায়ের এই প্রধান সামাজিক উৎসবকে সমষ্টিগতভাবে বলা হয় বৈসাবি। প্রতিবারের মতোই এবরো
তিন পার্বত্য জেলা রাঙামাটি, বান্দরবান এবং খাগড়াছড়িতে নানান আয়োজনে বৈসাবির বর্ণিল উৎসব মাতিয়ে তুলেছে পাহাড়ি নানান আদিবাসী জনগোষ্ঠীকে। পাহাড়ে ক্ষুদ্র নৃ-গোষ্ঠীর সম্প্রদায়ের প্রাণের উৎসব বৈ-সা-বি। ত্রিপুরা সম্প্রদায়ের বৈসু, মারমা সম্প্রদায়ের সাংগ্রাই ও চাকমাদের বিঝু- এ তিন সম্প্রদায়ের উৎসবের নামের প্রথম অক্ষর নিয়েই বৈসাবি’র নামকরণ। আর এটিই বর্তমানে পাহাড়ে উদ্যাপিত সবচেয়ে বড় উৎসব। উৎসবটি পাহাড়ের নৃ-গোষ্ঠীদের ঐতিহ্যবাহী প্রধান সমাজিক উৎসবও। বর্ষবরণ উৎসবকে চাকমারা বিজু, মারমারা সাংগ্রাই এবং ত্রিপুরা জনগোষ্ঠী বৈসুক বলে আখ্যা দিলেও গোটা পার্বত্য এলাকায় তা বৈসাবি নামেই পরিচিত। বাংলা বছরের শেষ দু’দিন এবং নতুন বছরের প্রথম দিন- এই তিন দিন মিলেই মূলত পাহাড়ে বর্ষবরণ উৎসব পালন করে নৃ-গোষ্ঠীরা। বান্দরবান : সাঙ্গু নদীতে ফুল ভাসানোর মাধ্যমে বান্দরবানে তঞ্চঙ্গ্যা সম্প্রদায়ের বিষু উৎসব শুরু হয়। গতকাল শুক্রবার সকাল ৭ টায় এ উৎসবের প্রথমদিন ছিল। তঞ্চঙ্গ্যারা বৈসাবিকে তাদের ভাষায় বিষু বলে থাকে। একইদিন চাকমারাও ভিন্ন নামে পালন করছে বিজু উৎসব। ফুল বিষু উপলক্ষে তঞ্চঙ্গ্যা সম্প্রদায়ের তরুণ-তরুণীরা সকালে বান্দরবানের বালাঘাটা মুখে সাঙ্গু নদীতে বাহারি রঙের ফুল ভাসিয়ে পরিবার ও জাতির জন্য মঙ্গল কামনা করে প্রার্থনা করেন। শহরের বালাঘাটাসহ বিভিন্ন পল্লীতে তরুণ-তরুণীরা মেতে উঠেছে শত বছরের ঐতিহ্যবাহী ঘিলা খেলায়। পূণ্য লাভের আশায় আয়োজন করেন এই ঘিলা খেলা। জেলা শহরের বালাঘাটা বিলকিচ বেগম উচ্চবিদ্যালয় মাঠে তঞ্চঙ্গ্যা সম্প্রদায়ের ঐতিহ্যবাহী ঘিলা খেলার আয়োজন করা হয়। রাতব্যাপি তঞ্চঙ্গ্যা যুবক-যুবতীরা ঘিলা খেলায় মেতে উঠেন। গত বৃহস্পতিবার সন্ধ্যায় প্রধান অতিথি হিসেবে ঘিলা খেলার উদ্ধোধন করেন পার্বত্য মন্ত্রী বীর বাহাদুর এমপি। এসময় জেলা প্রশাসক মো. দাউদুল ইসলাম, পুলিশ সুপার জাকির হোসেন মজুমদার, পার্বত্য চট্টগ্রাম আঞ্চলিক পরিষদ সদস্য কাজল কান্তি দাশ। এছাড়াও তঞ্চঙ্গ্যা কল্যাণ সংস্থার সভাপতি প্রসন্ন কান্তি তঞ্চঙ্গ্যা, বিষু উৎসব কমিটির আহবায়ক কাঞ্চন জয় তঞ্চঙ্গ্যাসহ তঞ্চঙ্গ্যা সম্প্রদায়ের নেতৃবৃন্দ এতে উপস্থিত ছিলেন। বান্দরবানে তঞ্চঙ্গ্যা সম্প্রদায়ের বিষু উৎসব কমিটির সদস্য সচিব উজ্জল তঞ্চঙ্গ্যা জানান, ঘিলা তঞ্চঙ্গ্যা সম্প্রদায়ের জন্য পবিত্র বস্তু। বিভিন্ন এলাকার তঞ্চঙ্গ্যারা এই খেলায় অংশগ্রহণ করেন। আগে ছোট পরিসরে আয়োজন করা হলেও এখন বর্ণাঢ্যভাবে এই খেলার আয়োজন করা হয়। ঘিলা খেলায় বান্দরাবন জেলা ছাড়াও রাঙামাটি থেকে এই খেলায় অংশগ্রহণ করেন। সারারাতব্যাপি তঞ্চঙ্গ্যা যুবক-যুবতীরা ঘিলা খেলা খেলে পুরাতন বছরকে বিদায় জানিয়ে নতুন বছরকে স্বাগত জানিয়ে বরণ করে নিবেন। তরুণ-তরুণীরাই মূলত এ ঘিলাখেলায় অংশ নেয়। খাগড়াছড়ি : চাকমা সম্প্রদায়ের নদীতে ফুল ভাসানোর মধ্য দিয়ে খাগড়াছড়িতে আনুষ্ঠানিকভাবে শুরু হয় এই উৎসবের। এই উৎসবকে তারা ফুল বিঝু বলে থাকেন। উৎসবকে ঘিরে মুখরিত এই পার্বত্য জনপদ। উৎসবের সূচনা উপলক্ষে খাগড়াছড়িতে কিরণের আলো ছড়ানোর আগেই ঐতিহ্যবাহী পোশাকে ও বর্ণিল সাজে দল বেঁধে হাতে বাহারি রঙের ফুল নিয়ে চেঙ্গী নদীর পাড়ে ভীড় জমান বিভিন্ন বয়সী নারী-পুরুষ। বাদ যায়না ছোট ছোট শিশুরাও। ভোরের সূর্য উদয়ের সাথে সাথে গঙ্গা দেবীর প্রার্থনার উদ্দেশ্যে নদীতে ফুল ভাসিয়ে দেয়া হয়। ফুল ভাসানোর মধ্য দিয়ে তারা পুরাতন বছরের জরাজীর্ণ গ্লানি, দুঃখ, কষ্টকে ভাসিয়ে দেয় এবং একই সাথে ফুলের পবিত্রতায় বরণ করে নেয় নতুন বছরকে। নতুন বছরের শুভ কামনায় নিজেদের পবিত্রতা কামনা করে থাকেন। ফুল ভাসানোর পর নদীতে স্নান শেষে ঘর সাজানোর কাজে ব্যস্ত হয়ে পড়েন তারা। এসময় নদীর পাড়ের পরিবেশ হয়ে উঠে উৎসবমূখর। শুরু হয় পাহাড়ের নৃ-গোষ্ঠীদের তিন দিনের বৈসাবি উৎসব। আজ শনিবার চাকমা সম্প্রদায় মূল বিজু আর পহেলা বৈশাখ বা গজ্জাপয্যা পালন করবেন। আজ ঘরে ঘরে চলবে অতিথি আপ্যায়ন। সেই সাথে সব বয়সী মানুষ নদী, খাল অথবা ঝরণায় গঙ্গা দেবীর পূজা আরাধনা করবেন। এছাড়াও ১৪ এপ্রিল নববর্ষের দিন থেকে মারমা অদিবাসীদের সাংগ্রাইং উৎসব শুরু হয়। ঐদিন মারমা স¤প্রদায়ের জলকেলি বা পানি খেলা দিয়ে সাংগ্রাইং উৎসব শুরু হবে। রাঙামাটি : বৈসাবি উপলক্ষে পাহাড়ি বাঙালি সকলের মাঝে বিঝু ও বৈসাবি ঘিরে পাহাড়ে রং লেগেছে। গতকাল শুক্রবার সকালে উপজাতি সম্প্রদায়ের প্রাণের উৎসব বিঝু শুরু হয় পার্বত্য জেলা রাঙামাটিতে। শুক্রবার সকালে কাপ্তাই লেকের গর্জনতলী, কেরানি পাহাড় ও রাজবাড়ি ঘাটে তরুণ তরুণীরা নদীতে ফুল ভাসিয়ে তাদের পেছনের সকল পাপ পানিতে বর্ষণ করে দিয়েছেন। তারা মনে করেন বিভিন্ন রকমের ফুল পানিতে ভাসিয়ে দিয়ে তাদের অতীতের সকল পাপ মোছন হয়ে গেছে। তাই তারা হাঁটু পানিতে নেমে তাদের নিজ নিজ ধর্ম মতে প্রার্থনা করে নদীতে ফুল ভাসিয়ে দেন। রাঙামাটি পার্বত্য জেলা পরিষদের চেয়ারম্যান বৃষ কেতু চাকমা ও পৌর মেয়র আকবর হোসেন চৌধুরী গর্জনতলী সংলগ্ন ত্রিপুরা ঘাটে কাপ্তাই লেকে ফুল ভাসিয়ে ফুল বিঝুর উদ্ধোধন করেন। এসময় উপস্থিত ছিলেন জেলা পরিষদ সদস্য স্মৃতি বিকাশ ত্রিপুরা ও গর্জনতলী এলাকার গণ্যমান্য ব্যক্তিবর্গ। জেলা পরিষদ চেয়ারম্যান বৃষ কেতু চাকমা বলেন, পুরনো বছরকে বিদায় ও নতুন বছরকে বরণ করে নিতে কাপ্তাই লেকে গঙ্গা দেবীর উদ্দেশ্যে ফুল ভাসানোর মধ্যে দিয়ে শুরু হলো বৈসাবির আনন্দ যাত্রা। আজ শনিবার থেকে উপজাতি সম্প্রদায় চাকমা, মারমা, ত্রিপুরা ও তঞ্চঙ্গাসহ ১১ টি ক্ষুদ্র জাতিসত্ত¡ার ধর্মীয় উৎস বিঝু, বিষু, বিহু, বৈসুক ও সাংগ্রাইন নামে পালন করা হচ্ছে। এই উৎসব চলবে টানা তিন দিন। উৎসবের ঐতিহ্যবাহী খাবার তৈরি হয় নানান সবজির পাঁচন। ঐতিহ্যবাহী এই পাঁচন তৈরি করতে হলে ১৮-২০ প্রকারের সবজির প্রয়োজন হয়। পাঁচনকে আবার কেউ কেউ গন্ড বলেও আখ্যায়িত করেন।

সর্বশেষ সংবাদ