সুস্থ সংস্কৃতিচর্চা যখন রুদ্ধ অপসংস্কৃতি তখন ঋদ্ধ-কামরুল হাসান বাদল লেখক : কবি ও সাংবাদিক

পোস্ট করা হয়েছে 03/10/2019-01:06pm:    ১. জামালপুরের ডিসির একটি আপত্তিকর ভিডিও ভাইরাল হয়েছিল কয়েক সপ্তাহ আগে। ফেসবুকের নিউজফিড ভরে গিয়েছিল সে ভিডিও এবং সে ডিসিকে নিয়ে নানা ব্যঙ্গ বিদ্রুপে। এর কিছুদিন আগে কবি রবীন্দ্র গোপেরও একটি ছবি ভাইরাল হয়েছিল। আমি অত্যন্ত বিস্ময়ের সঙ্গে লক্ষ্য করলাম, আপাত দৃষ্টিতে ভদ্র-সজ্জন এবং আধুনিক ও রুচিশীল মানুষ হিসেবে যাদের মনে করেছিলাম তাদের মধ্যেও অনেকে এসব ছবি আপলোড করেছেন। অত্যন্ত বাজে মন্তব্য করেছেন। এমন কয়েকজনকে দেখেছি মোবাইলে আপলোড করা সে ভিডিও গভীর আগ্রহে বন্ধু-স্বজনদের দেখাচ্ছেন। আমি অতীতেও লক্ষ্য করেছি, এ ধরনের সংবাদের প্রতি পাঠকের আকর্ষণ বেশি। কোনো সংবাদ মাধ্যমের অনলাইন ভার্সনে গেলে দেখা যাবে অধিক পঠিত বিভাগে এই ধরনের কেলেঙ্কারির সংবাদই অধিক পঠিত । আমি প্রত্যক্ষ করেছি, অনেকে পত্রিকায় সবকিছুর আগে এমন খবরই পড়েন। ধর্ষণের খবর, পালিয়ে বিয়ে করার খবর, বলাৎকার, যৌন হয়রানি এবং অসম সম্পর্কের মধ্যে কিছু ঘটলে সে সংবাদ বেশি পঠিত হয়। এই পরিস্থিতি বাংলাদেশ এবং এই উপমহাদেশের। পশ্চিমা বিশ্বের বাস্তবতা বা পরিস্থিতি জানার সুযোগ নেই আমার ফলে তা বলতে পারছি না। তবে বছর দুয়েক আগে একটি পশ্চিমা গণমাধ্যম জরিপ করে বলেছিল, নেতিবাচক সংবাদের পাঠক চাহিদা বেশি। অর্থাৎ পাঠকরা নেতিবাচক খবর পড়তে বেশি পছন্দ করেন।
জামালপুরের ডিসি এবং রবীন্দ্র গোপের বিষয়টি এত বেশি প্রচার হলো কেন? তার একটি ব্যাখ্যা খোঁজা দরকার। এবং এর মাধ্যমে আমাদের দেশের মানুষের মনস্তত্ত্ব বোঝার চেষ্টা করাও দরকার। রবীন্দ্র গোপ তার এক বান্ধবী বা পরিচিতজনকে নিয়ে একটি রেস্ট হাউসে গেছেন। তা তিনি যেতেই পারেন। তাঁর সঙ্গে যে নারী গেছেন সে নারী রবীন্দ্র গোপের বিরুদ্ধে অভিযোগ না তুললে এ বিষয়ে কারো নাক গলানোর অধিকার নেই। দুজন পূর্ণবয়স্ক নর-নারী যে কোনো স্থানে যেতে পারেন। আড্ডা দিতে পারেন। সেটি কোনো দোষের বিষয় হতে পারে না। ‘আপত্তিকর’ শব্দটিও আপেক্ষিক। তারপরও ধরে নিলাম বাংলাদেশের সামাজিক মূল্যবোধে আপত্তিকর কিছু দেখলেই দোষের হতে পারে। যতটুকু জেনেছি, রবীন্দ্র গোপ তেমন কিছুই করেননি। কিন্তু আমরা তাকে নিয়ে কী নিষ্ঠুর ট্রলই না করেছি।
জামালপুরের ডিসি যা করেছেন তা নিঃসন্দেহে নৈতিকস্খলনজনিত অপরাধ। তিনি তার সরকারি অফিসের ভেতরেই এমন অনৈতিক কাজটি করেছেন। তবে তাঁর অপরাধও কম নয়, যিনি গোপন ক্যামেরায় তা ধারণ করে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে তা ভাইরাল করেছেন। জামালপুরের ডিসির ভাইরাল হওয়া ভিডিও নিয়ে আমরা এতটা বাড়াবাড়ি করলাম যেন এমন বড় অপরাধ বাংলাদেশের আর সংঘটিত হয়নি। এর আগে কেউ করেনি। এবং আমরা সবাই ধোয়া তুলসি পাতা। আমাদের জীবনে কোনো দাগ নেই। জামালপুরের ডিসি ধর্ষণ করেননি। যা করেছেন দুজনের সম্মতিতে করেছেন। এটি নৈতিকস্খলনজনিত অপরাধ। এই অপরাধে ওই দুই পরিবার হয়ত ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে বা হবে কিন্তু এমন অনেক অপরাধ অন্যান্য ডিসি বা অন্য কেউ করছেন যার পরিণতিতে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে দেশ, জাতি, সংস্কৃতি। স্কুল-কলেজ-বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক, মাওলানা বা ঈমাম, মাদ্রাসার শিক্ষক কিংবা সমাজের গণ্যমান্য অনেকের দ্বারা দু বছরের শিশু থেকে ৭০ বছরের নারী ধর্ষিত হওয়ার খবর হরহামেশাই পাচ্ছি। একজন শিক্ষক বা ধর্মীয় কাজে সম্পৃক্ত ব্যক্তির কাছেও যখন আমাদের শিশুরা নিরাপদ নয় তখন সে অপরাধের কাছে ডিসি সাহেব নিজেও শিশু। আমি ব্যক্তিগতভাবে মনে করি জামালপুরের ডিসির চেয়েও বড় অপরাধ করেছিলেন চট্টগ্রামের প্রাক্তন ডিসি যিনি ডিসি হিলে সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান বন্ধ করে দিয়েছিলেন। জামালপুরের ডিসির অপরাধটি ব্যক্তিগত। চট্টগ্রামের প্রাক্তন ডিসির অপরাধটি সামাজিক। কারণ ডিসি হিলে সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান সীমিত (যা প্রায় বন্ধ করে দেওয়ার মতই) করে দিয়ে দেশ ও জাতির ক্ষতি করেছেন। সংস্কৃতিচর্চাকে রুদ্ধ করে দিয়েছেন। যার নেতিবাচক প্রভাব পড়েছে সংস্কৃতিচর্চার ওপর।
আমাদের অবদমিত সমাজে আমরা জামালপুরের ডিসিকে নগ্ন করে দিয়েছি কিন্তু চট্টগ্রামে এমন একটি অন্যায় হলো তার বিরুদ্ধে একটি শব্দও উচ্চারণ করিনি। এমনকি সংস্কৃতিকর্মীরাও জোরালো প্রতিবাদ করেনি।
২. একটি সমাজ বা রাষ্ট্রে সুস্থ সংস্কৃতিচর্চা ব্যহত হলে কী হয় তার উদাহরণ আমাদের সমাজেই বিদ্যমান। মানুষের জ্ঞানের জগৎ যদি প্রসারিত না হয়, মানুষ যদি প্রকৃত শিক্ষায় শিক্ষিত না হয় তাহলে সে মানুষ পূর্ণ মানুষ নয়, ঊণমানুষ। মানুষকে মানুষ হয়ে ওঠার জন্য, মানুষ হয়ে থাকার জন্য, তার ভেতর যে পশুপ্রবৃত্তি আছে তা ছাপিয়ে মনুষ্যত্ববোধ জাগ্রত করার জন্য মানুষকে নিরন্তর লড়াই করে যেতে হয়। চেষ্টা করে যেতে হয়। তা না হলে মানুষ মরে যায়। মরে যায় অর্থ, ভেতরের মানুষটি মরে যায়। যদিও তার বাইরের খোলসটি বেঁচে থাকে বটে।
সমাজে আজ যে অনাচার, অবিচার, ধুর্ততা, অনৈতিকতা, অসততা, নিষ্ঠুরতা এবং দুর্নীতি বৃদ্ধি পেয়েছে তার অন্যতম কারণ সমাজে মানবতাবোধ, সৌভ্রাতৃত্ববোধ, সৌহার্দ্যবোধ ও সততার চর্চা কম হয়েছে। মানুষকে মানুষ হয়ে থাকবার প্রচেষ্টা ক্ষুণ্ন হয়েছে। সমাজের এই প্রবণতা রোধ করতে পারে একমাত্র সাংস্কৃতিক জাগরণ। সুস্থ স্বাভাবিক সংস্কৃতিচর্চা ব্যহত হয়েছে বলেই তো আজ মাদকসেবন, জুয়া, হাউজি, ক্যাসিনোসংস্কৃতির প্রচলন বেড়েছে।
গত শতকের ছয়, সাত, আট দশক পর্যন্ত এ দেশের সাংস্কৃতিক পরিমণ্ডল বেশ সমৃদ্ধ ছিল। পাড়ায় পাড়ায় সামাজিক-সাংস্কৃতিক সংগঠন ছিল। যে কোনো জাতীয় দিবসতো বটেই নানা উপলক্ষ্যেও সেসব সংগঠন পাড়া মাতিয়ে রাখতো নানা উৎসবে। অফিসপাড়ায় নাটক হতো, সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান হতো। এর জন্য অনেক সরকারি অফিসে নিজস্ব মিলনায়তন ছিল। মঞ্চ ছিল। দেশজুড়ে বেশকটি শিশু সংগঠন ছিল। শিশুদের মনোবিকাশ এবং তাদের মানবিকচর্চায় উৎসাহিত করতে শিশু সংগঠনগুলোর বড় ভূমিকা ছিল। এই শহরেই অনেক সিনেমা হল ছিল। মুসলিম হলে নিয়মিত নাটক হতো, হোক না তা তথাকথিত কমার্শিয়াল। শিল্পকলা একাডেমিসহ বিভিন্ন স্থানে গ্রুপ থিয়েটার দলগুলোর নাটক হতো।
গ্রামে-গঞ্জে যাত্রা-পালা, সার্কাস, কবিগানের লড়াই, শরিয়ত-মারফতি গানের আসর হতো। স্কুল-কলেজে নিয়মিত সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান হতো। বাৎসরিক নাটক হতো। বাসে-ট্রেনে বাউলদের গান শোনা যেত। আজ সবকিছুই রুদ্ধ হয়ে গেছে। অনেক কিছু ‘না জায়েজ’ এর তালিকায় পড়ে একেবারে হারিয়ে গেছে। এর স্থান দখল করেছে ধর্মীয় উন্মাদনা, ধর্মান্ধতা, কূপমুণ্ডুকতা। সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানের স্থলে শুরু হয়েছে ওয়াজ মাহফিল, বাৎসরিক নাটক বা সাংস্কৃতিক উৎসবের পরিবর্তে শুরু হয়েছে বাৎসরিক মেজবান। গাড়িতে- ট্রেনে বাউল গানের পরিবর্তে শুরু হয়েছে কোনো মৌলানার ওয়াজের বয়ান।
এই পরিবর্তনের ফলে আমরা কী পেয়েছি? সমাজে দুর্নীতি বেড়েছে। অফিসে-অফিসে ঘুষ বেড়েছে, গাড়ি বা ট্রেনের দুর্ঘটনা বেড়েছে। সিনেমা না দেখে তার বদলে এখন মোবাইলে পর্ণো ছবি দেখছে। অনলাইনে জুয়া খেলছে, নাটক বা সঙ্গীতানুষ্ঠানে না গিয়ে ক্যাসিনোতে মদ গিলছে, জুয়া খেলছে আর অর্ধনগ্ন নৃত্য উপভোগ করছে। ক্রীড়া সংগঠনগুলো মাঠে খেলার আয়োজন বাদ দিয়ে ক্লাবের ভিতরে গভীর রাত পর্যন্ত ক্যাসিনো- বার- নাইটক্লাব চালু রাখছে।
রাজনীতি আর সংস্কৃতি যতদিন পাশাপাশি চর্চিত হয়েছে ততদিন রাজনীতি ছিল মানবিক, রাজনীতি ছিল গণমানুষের। রাজনীতি আজ সংস্কৃতিবিযুক্ত হয়ে দানবিক হয়ে উঠেছে। ফলে, রাজনীতিবিদরা এখন টাকার পেছনে ছোটে, জনকল্যাণের জন্য নয়। রাজনীতির আড়ালে তারা একেকটা টাকার কুমির। টাকার জন্য মদ-জুয়া-ক্যাসিনো ব্যবসা করতেও তাদের বিবেকে বাঁধে না। এই জুয়া-মদের টাকাতেই তারা আবার বছর বছর হজও করে। হারাম উপার্জনের টাকায় বিদেশে গিয়ে হন্যে হয়ে হালাল খাদ্য খোঁজে। এদেশে একজন গবেষক বা বিজ্ঞানিকে চেনে না কেউ কিন্তু কোনো ভণ্ডবাবার দরবার থাকে লোকে-লোকারণ্য।
একটি ভালো চলচ্চিত্র, একটি ভালো গান, একটি ভালো কবিতা, একটি ভালো উপন্যাস, একটি ভালো গল্প, একটি ভালো ছবি একটি মানুষকে বদলে দিতে পারে। তার ভেতর প্রেম-ভালোবাসা-মনুষ্যত্ববোধের আগ্রহ জাগিয়ে তুলতে পারে। যে জাতি সাংস্কৃতিকভাবে যত সমৃদ্ধ সে জাতি ততই সভ্য। একটি মানবগোষ্ঠীকে সভ্য করে তোলার জন্য সংস্কৃতিচর্চার বিকল্প কিছু নেই।
এই ঘুষপ্রবল দেশে ঘুষ দিতে হয় এমন কোনো কাজে সরকারি দফতরে যান। লক্ষ্য করুন সেই ঘূষ-দুর্নীতির ভিড়ে কখনো যদি কোনো মানবিক বা কিছুটা সহনশীল কোনো ব্যক্তিকে পান তাহলে খোঁজ নিয়ে দেখুন তিনি অতীতে কোনো না কোনো সংগঠন করেছেন, সৃজনশীল কোনো কাজের সঙ্গে একসময় জড়িত ছিলেন। আমার দুই কবি বন্ধু একদিন রোহিঙ্গা প্রসঙ্গে বলতে গিয়ে বললেন, তাদের মতো অসভ্য জাতি আর হয় না। তারা শৌচাগার পর্যন্ত ব্যবহার করতে জানে না। আমি প্রতিবাদ জানিয়ে বললাম, রোহিঙ্গাদের জন্য বাংলাদেশ সবদিক থেকে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে তাতে কোনো সন্দেহ নেই।
এই মুহূর্তে রোহিঙ্গারা বাংলাদেশ ত্যাগ করলে আমি বাঁচি, কিন্তু রোহিঙ্গাদের এই আচরণের জন্য শুধু রোহিঙ্গারাতো দায়ী নয়। কারণ মিয়ানমারে থাকতে ওরা আলোর দেখা তো পায়নি। শিক্ষা পায়নি, জ্ঞান পায়নি, স্বাস্থ্যসেবা পায়নি, উন্নত খাবার ও পোশাক পায়নি, মানুষ হিসেবে সামান্য মর্যাদাও পায়নি। অর্থাৎ সভ্যতা-ভব্যতা কাকে বলে সে শিক্ষাও তো তারা পায়নি। যে পরিবেশ ও আচরণের মধ্যে তারা জন্ম নিয়েছে, বেঁচে থেকেছে সেখান থেকে এর চেয়ে ভালো শিক্ষা তো সে অর্জন করার কথা নয়। আজ আমি যে ভদ্রতা-ভব্যতা, শিক্ষা-জ্ঞান, অভিরুচি মানবতাবোধের পরিচয় দিচ্ছি তা তো জন্মসূত্রে নিয়ে আসিনি। তা পরিবেশ, সমাজ-রাষ্ট্র থেকে নিয়েছি এবং নিজেকে তৈরি করেছি। কারণ ভালো-মন্দ বোঝার শিক্ষাটি অন্তত পেয়েছি।
আমাদের মুক্ত বাতায়নের দরকার। রুদ্ধঘরে আলো প্রবেশ করার সুযোগ নেই। সব জানালাগুলো খুলে দিতে হবে। জ্ঞান-বিজ্ঞানের চর্চা বাড়াতে হবে। ধর্মভিত্তিক সমাজব্যবস্থা শুধু বিভাজনই সৃষ্টি করবে। জ্ঞানভিত্তিক সমাজ মানুষকে মানুষ হিসেবে মর্যাদা দেওয়ার শিক্ষা দেবে। মানুষের বিবেককে জাগ্রত করার প্রেরণা যোগাবে।
সুস্থ সংস্কৃতিচর্চার পথ বন্ধ করে দিয়ে সমাজবিকাশের পথটাই আমরা রুদ্ধ করেছি। এখান থেকে বেরিয়ে আসতে হবে। নতুবা সমাজ আরও অন্ধকারে নিক্ষিপ্ত হবে।

সর্বশেষ সংবাদ