শুভ জন্মদিন প্রিয় প্রধানমন্ত্রী- কামরুল হাসান বাদল,লেখক,কবি, সাংবাদিক ও টিভি ব্যক্তিত্ব

পোস্ট করা হয়েছে 29/09/2019-11:22am:    ১৯৭৫ সালে শেখ হাসিনা যখন জার্মানি স্বামীর কর্মস্থলে যাচ্ছিলেন তখন তিনি ছিলেন সদ্য স্বাধীন হওয়া বাংলাদেশ নামক একটি রাষ্ট্রের প্রতিষ্ঠাতা ও রাষ্ট্রপতি জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের কন্যা এবং পরমাণুবিজ্ঞানী এম এ ওয়াজেদ মিঞার স্ত্রী। ১৯৮১ সালের ১৭ মে ছয় বছর পর তিনি যখন দেশে ফিরে আসলেন তখন তিনি এই উপমহাদেশের অন্যতম প্রাচীন দল আওয়ামী লীগ, যার নেতৃত্বে বাঙালি তার প্রথম স্বাধীন রাষ্ট্র অর্জন করেছে, তার সভানেত্রী। এই ছয় বছরে তার জীবনের ওপর অনেক ঝড় বয়ে গেছে। ইতিহাসের নির্মমতম হত্যাকা-ে তিনি তাঁর পিতা-মাতা, ভাই-বোন, ভাবী, চাচাসহ অনেক আত্মীয়কে হারিয়েছেন। এই পুরো সময় ধরে নিজের কাছে রাখা একমাত্র বেঁচে থাকা ছোটবোনকে নিয়ে লন্ডন-ভারতে নির্বাসিত নিঃসঙ্গ সহায় সম্বলহীন জীবন কাটিয়েছেন।
তাঁর অনুপস্থিতিতে তাকে বাংলাদেশ আওয়ামী লীগের সভানেত্রী নির্বাচিত করা হয়। তিনি ফিরে এসে দলের হাল ধরলেন বটে তবে সে কাজ, সে সংগ্রাম খুব সহজ ছিল না। এসে দল ও দেশকে রক্ষার লড়াইয়ে তিনি অবতীর্ণ হলেন। সে লড়াইয়ে তার প্রেরণা ছিল তাঁর পিতা, বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের আদর্শ আর তার সাহস ছিল দেশের মুক্তিকামী জনতার সমর্থন। সেদিনের সে সর্বস্বহারা, আনাড়ি হাতে দলের নেতৃত্ব দেয়া শেখ হাসিনা আর কয়েকদিন আগে জাতিসংঘের অধিবেশনে “হিরো অব ভ্যাকসিন” সম্মানে ভূষিত হওয়া এবং নৈশভোজে বিশ্বের সবচেয়ে ক্ষমতাধর রাষ্ট্র ও সরকার প্রধানদের মাঝে একই টেবিলে বসা শেখ হাসিনার বিস্তর ফারাক। বিস্তর ব্যবধান। এই ফারাক, এই ব্যবধান, এই উত্তরণের ‘মেকার’ তিনি নিজেই। নিজ মেধা, বিচক্ষণতা, দূরদর্শিতা, জেদ ও সাহস তাকে এ পর্যন্ত পৌঁছে দিয়েছে।
১৯৮১ থেকে ২০১৯। এই সময়কাল তিনি জয় করেছেন নিজেকে উত্তরণের জন্য, দলের শক্তি, জনপ্রিয়তা ও ব্যাপ্তি বিস্তারের জন্য। দেশের মানুষের মুক্তির জন্য। এই কঠিন কর্মসাধনে তিনি ব্যর্থ হননি। খাদের কিনার থেকে দলকে টেনে এনে মাত্র ২১ বছরে আবারও আওয়ামী লীগের সরকার প্রতিষ্ঠা করেছেন। এরপর ২০০৯ থেকে আজ অব্দি তাঁর নেতৃত্বেই আওয়ামী লীগ রাষ্ট্র পরিচালনা করছে।
এই দীর্ঘ যাত্রায় তাঁর পিতার মতো তাঁকেও হত্যা করার অপচেষ্ট করা হয়েছে। অন্তত ১৯ বার তাঁকে হত্যা চেষ্টা করা হয়। এরমধ্যে সবচেয়ে নিষ্ঠুর ও ভয়াবহ আক্রমণটি করা হয় ২০০৪ সালের ২১ আগস্ট বঙ্গবন্ধু অ্যাভেনিউতে আওয়ামী লীগের সমাবেশে। সে সময় সরকারি মদদেই শেখ হাসিনাসহ আওয়ামী লীগের সিনিয়র নেতাদের হত্যা করে দলটিকে নেতৃত্বশূন্য করার উদ্দেশ্যেই গ্রেনেড হামলা করা হয়। সৌভাগ্যক্রমে তিনি বেঁচে গেলেন তার সঙ্গে থাকা আইভি রহমানসহ অন্তত ত্রিশজন নেতাকর্মী সেদিন মৃত্যুবরণ করেছিলেন।
শেখ হাসিনার অর্জন কম নয়। একদিন তলাবিহীন ঝুড়ি বলে যে দেশকে পরিহাস করা হয়েছিল সে দেশটিকে তিনি আজ বিশ্বের দরবারে উন্নয়নের রোল মডেল হিসেবে পরিচিত করেছেন। উন্নত দেশগুলো কিংবা বিশ্বের ক্ষমতাধর রাষ্ট্র বা সরকার প্রধনারাও আজ সমীহের সাথে শেখ হাসিনার নাম উচ্চারণ করেন। শেখ হাসিনা যে একজন বিচক্ষণ রাষ্ট্রনেতা তা তিনি ইতিমধ্যে প্রমাণ করেছেন। ভূ-রাজনীতির ক্ষেত্রেও যে তিনি দক্ষ এবং ভারসাম্য নিয়ে চলতে পারেন তা ভারত-চীন-রাশিয়া-জাপান এবং মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে অত্যন্ত হৃদ্যতা ও মর্যাাদাপূর্ণ আচরণেই প্রতিফলিত হয়। তিনি তাঁর এই দক্ষতাকে কাজে লাগিয়ে এসব দেশকে উন্নয়নের সহযোগী হিসেবেও কাছে টেনে নিয়েছেন। তিনি যে শুধু অর্থনৈতিকভাবেই দেশকে এগিয়ে নিয়ে গেছেন তা নয়। অত্যন্ত দক্ষতার সাথে দেশে জঙ্গিবাদের উত্থানকে প্রতিহত করেছেন। শিক্ষা-স্বাস্থ্য-কৃষি-শিল্প মোট কথা সর্বক্ষেত্রে তার আমলে যে অভাবনীয় উন্নয়ন সাধন হয়েছে তা সম্ভব হয়েছে তার সুদূরপ্রসারী চিন্তা ও পরিকল্পনার গুণে।
একটি বিষয় আমি অত্যন্ত বিস্ময়ের সঙ্গে লক্ষ্য করি। পিতা-মাতা, ভাই-বোন হারিয়ে দীর্ঘ সময় বাইরে স্বজনহীন অবস্থায় কাটিয়ে যে শোক বা “ট্রমা”র মধ্য দিয়ে তাঁকে যেতে হয়েছে তা কাটিয়ে আবার সুস্থ ও স্বাভাবিক জীবনে ফিরে আসা অত্যন্ত কঠিন। আমি মনে করি শেখ হাসিনার সবচেয়ে বড় যুদ্ধ ছিল এই মানসিক অবস্থা বা ‘ট্রমা’ কাটিয়ে ওঠা। শেখ হাসিনা তা পেরেছেন। সে যুদ্ধেও তিনি জয়ী হয়েছেন। শুধু তাই নয়, তার পিতা-মাতার হত্যাকারী এবং তাকে হত্যার উদ্দেশ্যে হামলাকারীদের প্রতি তিনি ব্যক্তিগত আক্রোশ না দেখিয়ে দেশের প্রচলিত আইনে তাদের বিচারের ব্যবস্থা করেছেন। মৃত্যুর মুখে পড়া রোহিঙ্গাদের আশ্রয় দিয়ে তিনি “মাদার অব হিউম্যানিটি” খেতাব পেয়েছেন বটে তবে আমার দৃষ্টিতে হিউম্যানিটি বা মানবতার চূড়ান্ত তিনি তার বাবার খুনিদের প্রতি প্রদর্শন করেছেন।
শেখ হাসিনার প্রকৃত মূল্যায়ন এখনো হয়নি। হয়নি বলে আমারা অনুধাবন করতে পারিনি তিনি প্রকৃত অর্থে কত বড় মাপের নেতা। সে মূল্যায়নের জন্য আমাদের অপেক্ষা করতে হবে হয়ত। তবে তাঁর জন্মদিনে এটুকু কথা বলতেই হবে যে, তিনি যেন দীর্ঘায়ু হন। কারণ শেখ হাসিনার সঙ্গে একাত্তরের বাংলাদেশ, অসাম্প্রদায়িক বাংলাদেশ, সমৃদ্ধ বাংলাদেশের অস্তিত্ব জড়িত। শুভ জন্মদিন প্রিয় প্রধানমন্ত্রী। অনেকদিন বাঁচুন। বাংলাদেশকে বাঁচিয়ে রাখুন।

সর্বশেষ সংবাদ