রোহিঙ্গা সংকট, চীনা বুদ্ধি ও বাংলাদেশের অখণ্ডতা-কামরুল হাসান বাদল লেখক কবিও সাংবাদিক

পোস্ট করা হয়েছে 29/08/2019-10:48am:    ১। মাত্র তিনদিনের প্রস্তুতিতে কয়েক লাখ লোকের সমাবেশ করে রোহিঙ্গারা দেখিয়ে দিল আশ্রয় শিবিরগুলোতে সরকারি নিয়ন্ত্রণ কতটা শিথিল এবং এর বিপরীতে তারা কতটা সুসংগঠিত। বাংলাদেশের ইতিহাসে এত বড় জমায়েতের নজির আছে কি না আমি জানি না। এবং বিশ্বের কোথাও বা কোনো দেশে শরণার্থীরা এ ধরনের বিশাল সমাবেশ করতে পেরেছে কি না তাও আমি জানি না। তেমন কোথাও ঘটেছে বলে মনে করতে পারছি না অন্তত।
রোহিঙ্গা সমাবেশের পর আমার মতো অনেকের মনে প্রশ্ন উঠেছে রোহিঙ্গা আশ্রয়শিবিরগুলোতে সরকারি নিয়ন্ত্রণ কতটুকু কার্যকর। শিবিরগুলোতে কর্মরত দেশি-বিদেশি বেসরকারি সংস্থাগুলোর জবাবদিহিতা কতটুকু আছে। ভবিষ্যতে এ ধরনের সমাবেশ ঠেকানোর কৌশল বা পরিকল্পনা সরকারের আছে কি না?
বাংলাদেশে রোহিঙ্গা অনুপ্রবেশের দুই বছর পূর্ণ হলো গত ২৫ আগস্ট। বাংলাদেশে আশ্রয় নেওয়া রোহিঙ্গাদের নতুন সংগঠন “আরাকান রোহিঙ্গা সোসাইটি ফর পিস অ্যান্ড হিউম্যান রাইটস।” মূলত এই দলটির নির্দেশেই এখন বাংলাদেশে আশ্রয় নেওয়া রোহিঙ্গারা পরিচালিত হচ্ছে। এই সংগঠনের নিষেধের ফলেই সমাবেশের দুদিন আগে প্রত্যাবাসন প্রক্রিয়া সফল হয়নি। একজন রোহিঙ্গাও মিয়ানমার ফেরত যেতে রাজি হয়নি। প্রত্যাবাসন দিবসের দুদিন পর অনুপ্রবেশের দ্বিতীয় বর্ষপূর্তিতে সমাবেশ করে মিয়ানমারে ফিরে যাওয়ার আগে পাঁচটি শর্ত দিয়েছে তারা। যদিও একটিও শর্ত পূরণ করার ক্ষমতা বাংলাদেশের হাতে নেই। আসলে দু বছর আগে মানবতা দেখাতে গিয়ে বাংলাদেশ ফেঁসে গেছে রোহিঙ্গা সংকটে। যদিও মিয়ানমার থেকে বিতাড়িত হয়ে বাংলাদেশে রোহিঙ্গা অনুপ্রবেশের ঘটনা নতুন নয়। এর আগে অনেকবার ঘটেছে। তবে ২০১৭ সালের আগে এত বিপুল পরিমাণ রোহিঙ্গা বাংলাদেশে আসেনি। নতুন করে সাত লাখ রোহিঙ্গার সঙ্গে পুরনো এবং এদেশে এসে জন্ম নেওয়া রোহিঙ্গা শিশুদের যোগ করলে বাংলাদেশে এখন আশ্রয় নেয়া রোহিঙ্গার সংখ্যা ১৩/১৪ লাখের কম হবে না। রোহিঙ্গাদের পাঁচ দফা শর্ত হলো- তাদের নাগরিকত্ব ফিরিয়ে দেওয়া, নিরাপত্তার ব্যবস্থা করা, নিজেদের ভিটেবাড়ি ফিরিয়ে দেওয়া, ক্ষতিপূরণ দেওয়া এবং নির্যাতনকারীদের আন্তর্জাতিক আদালতে বিচার করা।
এই পাঁচ দফা শর্ত পূরণে কার্যত বাংলাদেশের কিছু করণীয় নেই। বিষয়টি মিয়ানমার সরকারের সিদ্ধান্তের বিষয়। তবে এটি সত্য যে, রোহিঙ্গাদের রাখাইনে ফিরে যাওয়ার ক্ষেত্রে মিয়ানমার সরকারের প্রতি রোহিঙ্গাদের আস্থার সংকটই বড় বাধা। শুরুতে রোহিঙ্গা সংকট নিয়ে বিশ্ব জনমত যেভাবে সোচ্চার হয়েছিল তা ক্রমশ স্তিমিত হয়ে এসেছে। শুরু থেকেই সংকটটির আন্তর্জাতিককরণের বিরোধিতা করে এসেছে চীন। মিয়ানমারের বিরুদ্ধে জাতিসংঘসহ বিশ্ব সংস্থাগুলোর যেকোনো কঠোর ও শাস্তিমূলক ব্যবস্থার বিরোধিতা করে এসেছে চীন ও রাশিয়া বিশেষ করে চীনের সরাসরি বাধার কারণে জাতিসংঘের কয়েকটি সিদ্ধান্ত স্থগিত করতে হয়েছে বা সিদ্ধান্ত গ্রহণ বাতিল করতে হয়েছে। শুরু থেকে চীন চেয়েছে বিষয়টি আন্তর্জাতিকভাবে মোকাবেলা না করে দ্বিপাক্ষিকভাবে ফয়সালা করতে। বাংলাদেশ সরকার চীনের কথায় আশ্বস্ত হলেও তাতে কোনো ফল পায়নি বাংলাদেশ।
২। চীন বাংলাদেশের বন্ধু রাষ্ট্র। দেশের উন্নয়ন সহযোগীও বটে। এই সময় দেশের বেশ কটি মেগাপ্রকল্পের কাজ চলছে চীনের আর্থিক ও কারিগরি সহায়তায়। রাশিয়াও বাংলাদেশের বন্ধু রাষ্ট্র। রাশিয়ার সাথেও বাংলাদেশের বিভিন্ন বিশেষ করে পারমাণবিক বিদ্যুৎ কেন্দ্রের মতো বড় প্রকল্পের কাজ চলছে। আর ভারতের সঙ্গে বাংলাদেশের সম্পর্ক প্রাচীন ঐতিহাসিক এবং হৃদ্যতাপূর্ণ। শুরু থেকেই চীন রোহিঙ্গা প্রশ্নে মিয়ানমারের ওপর আন্তর্জাতিক চাপ কমাতে চেষ্টা করে আসছে। কারণ মিয়ানমারের সঙ্গে চীনের সম্পর্ক পুরনো এবং মিয়ানমারে চীন বড় আকারের বিনিয়োগ করতে যাচ্ছে। আন্তর্জাতিক ক্ষেত্রে পরাশক্তি হিসেবে চীন হলো মিয়ানমারের মাথার ওপর ছাতা। একদিকে চীন চেষ্টা করছে বাংলাদেশ জাতিসংঘ আন্তর্জাতিক আদালত, ইইউ ও বিভিন্ন আন্তর্জাতিক মানবাধিকার সংস্থার কাছে অভিযোগ না করে মিয়ানমারের সঙ্গে দ্বিপাক্ষিকভাবে সংকট মোকাবেলা করুক। অন্যদিকে শরণার্থী ফিরিয়ে নিতে এবং মিয়ানমারে রোহিঙ্গাদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে চীন যে ব্যাপক ভূমিকা পালন করছে এমন নজিরও কোথাও দেখা যায়নি। বরং প্রত্যাবাসনের নামে মিয়ানমারের শঠতাকে সমর্থন জানিয়ে চীন আবার বলেছে তারা আন্তর্জাতিক চাপ মোকাবেলায় মিয়ানমারের পক্ষে থাকবে। আমাদের সমাজে একটি কথা প্রচলিত আছে “চীনা বুদ্ধি” নামে। যে ব্যক্তির বুদ্ধি চিন্তা একটু দু-নম্বারি, বিতর্কিত এবং প্যাঁচ লাগানো তেমন ব্যক্তির বুদ্ধি-পরামর্শকে সাধারণ মানুষ “চীনা বুদ্ধি” বলে সম্বোধন করে। এটি নেতিবাচক দৃষ্টিভঙ্গিতেই বলে। রোহিঙ্গা ইস্যুতে বাংলাদেশ শেষ পর্যন্ত ‘চীনা বুদ্ধিতে’ ঘায়েল হচ্ছে কিনা তা নিয়ে আশঙ্কা থেকে গেল। চীনের ওপর সম্পূর্ণ আস্থা রাখতে গিয়ে বাংলাদেশকে বড় ক্ষতির মুখে পড়তে হচ্ছে কি না তা বিবেচনায় রাখতে হবে।
৩। আগে উল্লেখ করেছি রোহিঙ্গা প্রশ্নে বিশ্ব জনমত বা জাতিসংঘসহ কয়েকটি বৃহৎ রাষ্ট্রের অবস্থানেরও পরিবর্তন হচ্ছে। মিয়ানমারের ওপর আন্তর্জাতিক চাপ অব্যাহত রাখতে শুরু থেকে যুক্তরাষ্ট্র, ইউরোপ ও জাতিসংঘ পাশে থাকলেও এখন পরিস্থিতি পাল্টে যাচ্ছে। গত শুক্রবার নিরাপত্তা পরিষদের এক বৈঠকে মার্কিন প্রতিনিধি রাখাইনে মানবাধিকার লংঘনের জবাবদিহি নিশ্চিত করার ক্ষেত্রে মিয়ানমারের অভ্যন্তরীণ প্রক্রিয়ার ওপর ছেড়ে দেওয়ার পক্ষে মত দিয়েছেন। অথচ যুক্তরাষ্ট্র ২০১৭ সালের ২৫ আগস্ট থেকে রাখাইনে রোহিঙ্গা নিধনের জবাবদিহিতা নিশ্চিত করতে যুক্তরাষ্ট্র আন্তর্জাতিক তদন্তের কথাই বলে আসছিল। রোহিঙ্গা প্রশ্নে মিয়ানমার যে সুষ্ঠু তদন্ত করবে না তা একটি শিশুও বোঝে।
কারণ মিয়ানমারের এই ছল-চাতুরি নতুন নয়। প্রত্যাবাসন প্রক্রিয়া শুরুর নামে প্রতিবারই তারা বলটি বাংলাদেশের পায়ে ঠেলে দেয় আর বাংলাদেশ অদক্ষ খেলোয়াড়ের মতো নিজের গোল নিজে খায়। গতবার প্রত্যাবাসন প্রক্রিয়া ব্যর্থ হওয়ার দায় তারা বাংলাদেশের ঘাড়ে চাপিয়েছিল। এবারও করল তাই। সেপ্টেম্বরে জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদের অধিবেশনকে সামনে রেখে মিয়ানমার প্রত্যাবাসন খেলায় নেমেছিল। বাংলাদেশ পক্ষ দূরদর্শি চিন্তা ও সমন্বয়হীনতার কারণে এবারও হেরে গেছে মিয়ানমারের কাছে। ফিরে যাওয়ার মতো কাউকে আগে থেকে উৎসাহিত ও প্ররোচিত না করে মিয়ানমারের প্রত্যাবাসন নাটকের ফাঁদে পড়া চরম বোকামি হয়েছে।
বাংলাদেশ পক্ষ কি আগে থেকে একটুও আঁচ করতে পারেনি যে, একজন রোহিঙ্গাও ফেরত যাওয়ার জন্য প্রস্তুত নয়? এবারও জাতিসংঘে মিয়ানমার বলার সুযোগ পাবে যে তারা ফিরিয়ে নিতে চেয়েছিল বাংলাদেশ পাঠাতে পারেনি। বাংলাদেশ সরকারের গোয়েন্দারা কি জানে না রোহিঙ্গা শিবিরে কোন কোন বেসরকারি সংস্থা, বিদেশি সংস্থা রোহিঙ্গাদের ফিরে না যেতে উৎসাহিত করছে? মাত্র তিনদিনের প্রস্তুতিতে কিভাবে এত বড় একটি সমাবেশ অনুষ্ঠিত হলো? আয়োজনের পেছনে কারা কোন উদ্দেশে করছে তা কি খতিয়ে দেখছে গোয়েন্দা সংস্থা। মোবাইলের মাধ্যমে ইন্টারনেটের সহায়তায় কয়েকটি ‘অ্যাপস’ ব্যবহার করে এত বিশাল নেট ওয়ার্ক তৈরি করল রোহিঙ্গারা, গোয়েন্দারা আগে কিছুই আঁচ করতে পারলো না? সাদা কাপড়ের এত লাখ লাখ লুঙ্গি কোর্তা পাঞ্জাবি টুপি জোগাড় হলো কী ভাবে? তা সরবরাহ করলো কারা? তা শিবিরে শিবিরে পৌছে দিল কারা?
রোহিঙ্গাদের নিয়ে বড় বাণিজ্যে নেমেছে দেশি-বিদেশি অনেক সংস্থা ও প্রতিষ্ঠান। উপার্জনের বড় ক্ষেত্র হিসেবে দেখছে এটিকে অনেকে। এখানে কাজ করছে ১২৩টি প্রতিষ্ঠান। এরমধ্যে ২১টি আন্তর্জাতিক প্রতিষ্ঠান। স্থানীয় ৫টি। এবং জাতীয় ৯৭টি। বিতর্কিত কর্মকান্ডের জন্য নিষিদ্ধ হয়েছে ৪১টি। এতগুলো প্রতিষ্ঠানের কাজ কী? এরা সেখানে কী করছে, কার স্বার্থ রক্ষা করছে তা দেখার কেউ আছে কি না তাও স্পষ্ট নয়।
৪। ইতিমধ্যে রোহিঙ্গা শিবিরগুলো যে ভয়ঙ্কর হয়ে উঠেছে তা আর বলার অপেক্ষা রাখে না। কিছু কিছু শিবির দেশি অস্ত্রের ভানণ্ডার হয়ে উঠেছে। দিন দিন বেপরোয়া হয়ে উঠছে রোহিঙ্গারা। এক যুবলীগ নেতা হত্যাকে কেন্দ্র করে স্থানীয়দের মধ্যে চরম অসন্তোষ বিরাজ করছে। আগে থেকেই স্থানীয়রা রোহিঙ্গাদের আগমন ও আচরণে চরম ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। এই দানাবাধা ক্ষোভের যে কোনো সময় বিস্ফোরণ ঘটতে পারে। অন্যদিকে রোহিঙ্গাদের হাতেও আছে অস্ত্র । তাদের নেটওয়ার্ক এখন পূর্বের চেয়ে অনেক মজবুত। কয়েক ঘন্টার নোটিশে যে তারা লাখ মানুষের সমাবেশ করতে পারবে বা সড়কে নামিয়ে আনতে পারবে সে সক্ষমতা তারা দেখিয়ে দিয়েছে। ফলে সামনের দিনগুলো যে শান্তিপূর্ণ হবে না তা বোঝা যাচ্ছে। রোহিঙ্গাদের মধ্যে একটি ধারনা দেওয়া হয়েছে যে, তাদের মাথা বিক্রি করে বাংলাদেশের মানুষ খাচ্ছে। তাদের জন্য বিদেশ থেকে যে সাহায্য আসে তার ওপর ভরসা করে বাংলাদেশ চলছে। এধরনের প্রচার ও বাংলাদেশ এবং বাংলাদেশের জনগণকে গালিগালাজ করা এমন ভিডিও অনেকের কাছে আছে। সেখানে এক রোহিঙ্গা যুবক বাংলাদেশকেই হুমকি দিচ্ছে।
বাংলাদেশকে হুমকি দিলেও এরা যে এই অঞ্চলের শান্তি-শৃঙ্খলার জন্য ইতিমধ্যেই হুমকি হয়ে উঠেছে তা আর বলার অপেক্ষা রাখে না। দশ বারো লাখ রোহিঙ্গাকে বাংলাদেশে ঠেলে দিয়ে আজ চীন-মিয়ানমার-ভারত যদি নিজেদের নিরাপদ রাখতে পারবে বলে মনে করে থাকে তবে তা মস্ত বড় ভুল। এই বিপুল সংখ্যক রোহিঙ্গার মধ্যে থেকে যদি ৫০ হাজার রোহিঙ্গাও উগ্র জঙ্গিবাদে জড়িয়ে যায় তখন তা শুধু বাংলাদেশের অখণ্ডতার জন্যই হুমকি হবে তা নয়। মিয়ানমারের জ্বালিয়ে দেওয়া সে আগুন থেকে খোদ মিয়ানমার, মিয়ানমারে লগ্নি করা চীনের অর্থ, ভারতের লগ্নি ও ভূখন্ড কোনটিই নিরাপদ থাকবে না।
বিপদটি যত দ্রুত মিয়ানমার-চীন-ভারত বুঝতে পারবে ততই মঙ্গল হবে। লেখক : কবি ও সাংবাদিক

সর্বশেষ সংবাদ