লাখো হাজীর ধ্বনিতে মুখরিত আরাফাত ময়দানে আল্লাহর করুণা প্রার্থণা

পোস্ট করা হয়েছে 12/09/2016-08:49am:    এস,আহমেদ ডেক্স প্রতিবেদনঃ পাপমুক্তি আর আত্মশুদ্ধির আকুল বাসনায় পবিত্র মক্কা নগরীর অদূরে ‘উকুফে আরাফা’ অবস্থানের মধ্য দিয়ে কাল পবিত্র হজ পালন করেছেন গোটা দুনিয়া থেকে আগত লাখো ধর্মপ্রাণ মুসলমান। মতপার্থক্য ভুলে মুসলিম বিশ্বের নেতাদের এক হওয়ার আহ্বান ধ্বনিত হল এবারের হজে। রবিবার হজের মূল অনুষ্ঠান মক্কার আরাফাতের ময়দানে খুৎবায় পৃথিবীর নানা প্রান্তের, নানা বর্ণের লাখো মুসলিমের সমাবেশে এই আহ্বান জানানো হয়। আইএসের মতো উগ্র গোষ্ঠীকে নিয়ে মুসলিম দেশগুলোর সমস্যার মধ্যে সৌদি আরবের সঙ্গে দ্বন্দ্বে ইরানের বর্জনের প্রেক্ষাপটে খুৎবা নিয়ে আসেন শেখ আবদুল রহমান আল-সুদাইস। মসজিদুল হারামের এই ইমাম বলেন, নিজেদের মধ্যেম যে সমস্যােগুলো রয়েছে, তার সমাধান করতে মুসলিম বিশ্বের নেতাদের এক হতে হবে। আরাফাতের পাহাড়ঘেরা ময়দান ছাপিয়ে আকাশ-বাতাস মুখর ও প্রকম্পিত হতে থাকে আবেগাপ্লুত বেশুমার কণ্ঠের ‘লাব্বাইক/ আল্লাহুম্মা লাব্বাইক/ লা-শারিকালাকা লাব্বাইক, ইন্নাল হামদা ওয়ান্ নে’মাতা লাকা ওয়াল মুলক লাশারিকা লাক’— তালবিয়ায়। ‘জাবালে রাহমত’ সাদা আর সাদায় একাকার। আদিগন্ত মরুপ্রান্তর এক অলৌকিক পুণ্যময়তা অধিকার করে রাখে। এক অপার্থিব আবহ রচিত হয় পুরো ময়দানে। সবার পরনে সাদা দুই খণ্ড বস্ত্র। নেই আশরাফ-আতরাফ বিভেদের অচলায়তন। দুনিয়া ও আখিরাতের কল্যাণ, রহমতপ্রাপ্তি ও নিজের গুনাহ মাফের জন্য আল্লাহ তায়ালার মহান দরবারে অশ্রুসিক্ত ফরিয়াদ জানান সমবেত মুসলমানরা। একে অপরের সাথে পরিচিত হন, কুশল বিনিময় করেন। বিশ্ব ভ্রাতৃত্বের এক অনুপম দৃশ্যের অবতারণা হয় সেই ময়দানে। বিশ্ব মুসলমানের মহাসম্মিলনের দিন। ইরানের বর্জনে বিশ্ব মুসলিমদের বার্ষিক সম্মিলন হজে এবার বিভেদের ছায়া পড়েছে। গত বার হজের আনুষ্ঠানিকতার মধ্যে মিনায় পদদলনে হতাহতের ঘটনার জন্য দুই দেশ পরস্পরকে দোষ দিয়ে আসছে। সুন্নিপ্রধান রাষ্ট্র সৌদি আরব ওই ঘটনার জন্যে শিয়াপ্রধান দেশ ইরানের হাজিদের দায়ী করলে তেহরানের পক্ষ থেকে ব্যবস্থাপনায় ত্রুটির জন্যই রিয়াদকে দায়ী করা হয়। এরপর দুই পক্ষের পাল্টাপাল্টির মধ্যে ইরান হজ বর্জনের ঘোষণা দেয়। সম্প্রতি ইরানের সর্বোচ্চ ধর্মীয় নেতা আয়াতুল্লাহ আলি খামেনি আবার বিষয়টি তুললে সৌদি আরবের গ্রান্ড মুফতি আবদুল আজিজ আল শেখ ইরানিদের মুসলমানিত্ব নিয়ে প্রশ্ন তোলেন। মধ্যপ্রাচ্যোর প্রভাবশালী দুই রাষ্ট্রের মধ্যে। এই টানাপড়েন চলার মধ্যে ইরান ছাড়া বাংলাদেশসহ সারাবিশ্ব থেকে ২০ লাখের বেশি মুসলিম এবার সৌদি আরবে হজে মিলিত হয়েছেন। অসুস্থতার কারণে গ্রান্ড মুফতি আবদুল আজিজ আল শেখের অনুপস্থিতিতে খুৎবা দিতে আসা কাবা শরিফের ইমাম আল-সুদাইস হজের মতো ধর্মীর অনুষ্ঠানকে ‘রাজনীতির বাইরে’ রাখতে সব মুসলিমদের প্রতি আহ্বান জানান। সেই সঙ্গে বিভিন্ন বিষয়ে অতিরঞ্জিত সংবাদ প্রকাশ না করতে এবং গুজব না ছাড়াতেও সংবাদ মাধ্যমকে পরামর্শ দেন তিনি। আইএসের মতো ধর্মীয় উগ্রবাদীদের বিষয়ে সচেতন থাকতে মুসলিমদের প্রতি আহ্বান জানিয়ে আল-সুদাইসি বলেন, সন্ত্রাসবাদীদের কোনো ধর্ম নেই, কোনো দেশ নেই। সন্ত্রাসবাদীরা যেন তরুণদের বিভ্রান্ত করতে না পারে, সেজন্য মুসলিম প-িত, ধর্মীয় নেতা থেকে শুরু করে পরিবার প্রধানদের দায়িত্বশীল হওয়ার পাশাপাশি ধর্মীয় উগ্রপন্থা পরিহারের আহ্বান জানানো হয় খুৎবায়। অসুস্থতার কারণে খুৎবা না পড়লেও আরাফাতের ময়দানে একটি চেয়ারে বসেই খুৎবা শোনেন গ্রান্ড মুফতি আবদুল আজিজ আল শেখ। মক্কার গভর্নর প্রিন্স খালিদ আল-ফয়সালও ছিলেন তার পাশে। ময়দানজুড়ে শুভ্রপোশাকে মুসল্লিদের কণ্ঠে দিনভর ধ্বনিত হচ্ছিল-‘লাব্বাইক আল্লাহুম্মা লাব্বাইক, লাব্বাইক লা শারিকা লাকা লাব্বাইক, ইন্নাল হামদা ওয়াননি’মাতা লাকা ওয়ালমুলক’ ধ্বনি। এর অর্থ হল, “আমি হাজির। হে আল্লাহ আমি হাজির, তোমার কোনো শরিক নেই; সব প্রশংসা ও নিয়ামত শুধু তোমারই, সব সা¤্রাজ্যও তোমার।” আরাফাতের ময়দানে রবিবার খুৎবা এবং ইবাদতে মশগুল মুসলিমরা আজ সোমবার মক্কায় ফিরে পশু কোরবানির মধ্যা দিয়ে হজের আনুষ্ঠানিকতা শেষ করবেন। সৌদি আরবের সংবাদ মাধ্যমের হিসাব অনুযায়ী, বিশ্বের ১৬৪টি দেশের প্রায় ২০ লাখের বেশি ধর্মপ্রাণ মুসলমান এবার হজ করছেন, যাদের মধ্যে এক লাখের বেশি বাংলাদেশি। এই মুসলমানরা শুক্রবার মসজিদুল হারামে (কাবা শরিফ) জুমার নামাজ পড়েন। পরে মক্কা থেকে তারা জড়ো হন ১০ কিলোমিটার দূরে তাঁবুনগরী মিনায়। শনিবার মিনায় ইবাদতে রাত কাটানোর পাশাপাশি আল্লাহর নৈকট্য লাভের আশায় তারা জিকির করেন, নামাজ পড়েন জামায়াতের সঙ্গে। রবিবার আরাফাত থেকে মিনায় ফেরার পথে সন্ধ্যায় মুজদালিফায় মাগরিব ও এশার নামাজ পড়বেন তারা। মুজদালিফায় রাতে থাকার সময় তারা পাথর সংগ্রহ করবেন, যা মিনার জামারায় শয়তানকে উদ্দেশ্য করে ছোড়া হবে। সোমবার সকালে মিনায় ফিরে সেই পাথর তারা প্রতীকী শয়তানকে লক্ষ্য করে ছুড়বেন। এরপর কোরবানি দিয়ে ইহরাম ত্যাগ করবেন এবং সবশেষে কাবা শরিফকে বিদায়ী তাওয়াফের মধ্যে দিয়ে হাজি হবেন তারা। আরব নিউজের এক প্রতিবেদনে বলা হয়, আবহাওয়া আরামদায়ক না হলেও হজ করতে আসা মুসলমানরা তা আমলে নিচ্ছেন না। আরাফাতের ময়দান সমুদ্রপৃষ্ঠ থেকে প্রায় ২৫০ মিটার উঁচুতে। চারপাশে পাহাড়ঘেরা একটি সমতল ভূমি। হাজিদের কেউ কেউ সেখানে তাঁবু টানিয়ে, কেউবা খোলা আকাশের নীচে মাথায় ছাতা ধরে অবস্থান করেন। অনেকে আগের রাতেই সোজা উঠে যান আরাফাত ময়দান সংলগ্ন ৭০ মিটার উঁচু ‘জাবালে রহমত’ তথা রহমতের পাহাড়ে। রহমতের পাহাড়ে উঠে সেখানেই তাঁরা দিনভর মহান আল্লাহর করুণা ও মাগফিরাত কামনা করেন। বিশ্বের সর্ববৃহত্ মসজিদ ‘মসজিদে নামিরাহ’ থেকে জুমার নামাজের আগে বয়ান ও খুতবা পাঠ করেন সৌদি আরবের মুফতি। এই মসজিদকে একদিনের মসজিদ বলা হয়। আরাফাত ময়দানে অবস্থান করা হজের অন্যতম ‘ফরজ’ বা অবশ্য পালনীয়। আরাফাতের পাহাড়ে একটি বড় উঁচু পিলার আছে। একে কেউ কেউ দোয়ার পাহাড়ও বলে থাকেন। উঁচু পিলারের কাছে যাওয়ার জন্য পাহাড়ে সিঁড়ি করা আছে, যাতে এটি বেয়ে খুব সহজে চূড়ায় চলে যাওয়া যায়। জনশ্রুতি আছে যে, হযরত আদম (আ.) ও বিবি হাওয়া (আ.) দীর্ঘদিন কান্নাকাটির পর এখানেই এসে মিলিত হয়েছিলেন। হাজিরা আরাফাত ময়দানে অবস্থান শেষে তাদের গন্তব্য মুজদালিফা। মুজদালিফায় গিয়ে মাগরিব ও এশা’র নামাজ এশা’র ওয়াক্তে একত্রে পড়বেন এবং সমস্ত রাত অবস্থান করবেন। মিনায় জামরাতে নিক্ষেপ করার জন্য ৭০টি কংকর এখান থেকে সংগ্রহ করবেন। মুজদালিফায় ফজরের নামাজ পড়ে মিনার উদ্দেশে রওনা হবেন। ১০ জিলহজ মিনায় পৌঁছার পর হাজিদের পর্যায়ক্রমে চারটি কাজ সম্পন্ন করতে হয়। প্রথমে মিনাকে ডান দিকে রেখে হাজিরা দাঁড়িয়ে শয়তানকে (জামারা) পাথর নিক্ষেপ করবেন। দ্বিতীয় কাজ আল্ল­­াহর উদ্দেশে পশু কোরবানি করা। অনেকেই মিনায় না পারলে মক্কায় ফিরে গিয়ে পশু কোরবানি দেন। তৃতীয় পর্বে মাথা ন্যাড়া করা। চতুর্থ কাজ তাওয়াফে জিয়ারত। হাজিরা মক্কায় ফিরে কাবা শরীফ ‘তাওয়াফ’ ও ‘সাঈ’ (কাবার চারদিকে সাতবার ঘোরা ও সাফা-মারওয়া পাহাড়ে সাতবার দৌড়ানো) করে আবার মিনায় ফিরে যাবেন। জিলহজের ১১ তারিখ মিনায় রাত যাপন করে দুপুরের পর থেকে সূর্যাস্তের পূর্ব মুহূর্ত পর্যন্ত সময়ের মধ্যে হাজিরা বড়, মধ্যম ও ছোট শয়তানের উপর সাতটি করে পাথর নিক্ষেপ করবেন। পরদিন ১২ জিলহজ মিনায় অবস্থান করে পুনরায় একইভাবে হাজিরা তিনটি শয়তানের উপর পাথর নিক্ষেপ করবেন। শয়তানকে পাথর নিক্ষেপ করা শেষ হলে অনেকে সূর্যাস্তের আগেই মিনা ছেড়ে মক্কায় চলে যান। আর মক্কায় পৌঁছার পর হাজিদের একটি কাজ অবশিষ্ট থাকে। সেটি হচ্ছে কাবা শরীফ তাওয়াফ করা। একে বলে বিদায়ী তাওয়াফ। স্থানীয়রা ছাড়া বিদায়ী তাওয়াফ অর্থাত্ কাবা শরীফে পুনরায় সাতবার চক্কর দেওয়ার মাধ্যমে হাজিরা সম্পন্ন করবেন পবিত্র হজব্রত পালন। মুসলমানদের বিশ্বাস অনুযায়ী, আদি পিতা আদম ও আদি মাতা হাওয়া পৃথিবীতে পুনর্মিলনের পর এই আরাফাতের ময়দানে এসে আল্লাহর কাছে কৃতজ্ঞতা জানিয়েছিলেন। ১৪ শ’ বছরেরও বেশি সময় আগে এখানেই ইসলামের শেষ নবী হজরত মুহাম্মদ (স.) দিয়েছিলেন তার বিদায় হজের ভাষণ। ইসলামী রীতি অনুযায়ী, জিলহজ মাসের নবম দিনটি আরাফাতের ময়দানে অবস্থান করে ইবাদতে কাটানোই হল হজ। ছড়িয়ে দিন:

সর্বশেষ সংবাদ