ছোট কর্তব্য, বড় প্রতিদান

পোস্ট করা হয়েছে 04/01/2016-08:53pm:   
https://www.youtube.com/watch?v=Heqk60S5YTo

টিভিতে এই বিজ্ঞাপনটা দেখেছি অনেক আগেই। সম্ভবত ভারতীয় বাংলা কোন চ্যানেলে। তখন থেকেই এটা নিয়ে লেখার ইচ্ছে ছিল। ইন্টারনেটে অনেক খোঁজাখুঁজি করে বিজ্ঞাপনচিত্রের লিঙ্ক পেলাম। তারপরেও লেখার সময় করে উঠতে পারিনি।
আজ ভোরে পৃথিবীর এই অংশে মাঝারি মানের থেকে একটু বড় ভূমিকম্প হল। সবাই নানানভাবে এর প্রতিক্রিয়া ব্যক্ত করছে। মোটামুটি সবাই এরকম দূর্যোগের পরে ধার্মিক হয়ে যায়। তবে, সবাই ভুলে যায়, প্রার্থনা বা অপঙ্কিল জীবনযাপনের চেয়ে প্রাকৃতিক দূর্যোগ প্রতিরোধের সবচেয়ে ভাল উপায় হল "সচেতনতা"। স্রষ্টা মানুষকে অন্য প্রাণীদের থেকে পৃথক করে বানিয়েছেন যাতে সে নিজের বুদ্ধি-বিবেক দিয়ে বিপদকে এড়িয়ে চলতে পারে, বিপদের মোকাবেলা করতে পারে। তাই, আমরা সেই দায়িত্ব পুরোটা তার উপর ছেড়ে দিয়ে বসে থাকতে পারি না।

এবার, ঐ বিজ্ঞাপনচিত্রের ব্যাপারে আসি। এর মাধ্যমে জনগণকে যা শেখাতে চেষ্টা করা হয়েছে, তা নিচে পয়েন্ট আকারে লিখলামঃ-
১) নির্দিষ্ট স্থানে ময়লা ফেলতে হবে। জনগণের চলাচলের পথ, যেকোন জলাশয়, খাল-নর্দমা, খেলার মাঠ ইত্যাদি স্থানকে ভ্রাম্যমাণ ডাস্টবিন হিসেবে ব্যবহার করা যাবে না।
২) পচনশীল ও অপচনশীল আবর্জনার জন্য প্রত্যেক ঘরে ঘরে পৃথক রঙ-এর আলাদা দুটি ডাস্টবিন সরবরাহ করা হয়েছে। সবাই যার যার ঘর বা কর্মস্থলের ময়লা-আবর্জনার ডাস্টবিন দুটো নিয়ে আবর্জনা সংগ্রহকারী কতৃপক্ষের নির্দিষ্ট গাড়ী বা নির্দিষ্ট স্থানে তা ফেলে আসবেন।
এবার কিছুটা ব্যাখা-বিশ্লেষণ করি।
যেকোন প্রাকৃতিক বিপর্যয় প্রতিরোধের জন্য সবার আগে প্রয়োজনঃ- পরিবেশ দূষণ রোধ করা, প্রাকৃতিক ভারসাম্য বজায় রাখা, এবং পরিবেশবান্ধব পণ্য ও প্রযুক্তির সদ্ব্যবহার। যদিও ভূমিকম্প এমন একটি দূর্যোগ, যেটা প্রতিরোধে মানুষ প্রত্যক্ষভাবে কোন পদক্ষেপ নিতে পারবে না, তবুও এমন অসংখ্য কাজ ও উদ্যোগ আছে, যার মাধ্যমে ভূমিকম্পের ক্ষয়ক্ষতি অনেকাংশে কমিয়ে আনা যেতে পারে।

পচনশীল আবর্জনা হল- মানুষের রান্নার আগে খাবার থেকে ফেলে দেওয়া উচ্ছিষ্ট এবং খাদ্যগ্রহণের পরে ফেলে দেওয়া অবশিষ্ট। সহজ কথা, যেকোন জীব- উদ্ভিদ বা প্রাণীর দেহাবশেষ সহজেই প্রকৃতিতে (মাটি, পানি বা বায়ু) পচে যায়। অণুজীব বা ভাইরাস-ব্যাক্টেরিয়ার মত প্রাণীরা এসব জৈব পদার্থ খেয়ে ফেলে; যাকে আমরা সহজ ভাষায় "পচে যাওয়া" বলি।
অন্যদিকে, অপচনশীল আবর্জনা হল- অজৈব যেকোন বস্তু, যা জীবের দেহাবশেষ নয়, বা জীব থেকে সৃষ্ট নয়। প্লাস্টিক, পলিথিন, ধাতু, রাবার, কাঁচ, মেলামাইন ইতাদি সহজে পচে না, বা একদমই পচে না। অণুজীবেরা এসব অজৈব এসব বস্তু খেয়ে নষ্ট করতে পারে না। মাটি, পানি বা বায়ুকে এসব পদার্থ দূষিত করে।
আমরা যদি ফেলে দেওয়ার সময় থেকে প্রক্রিয়াকরণ/ পুনর্ব্যবহারযোগ্যকরণ/ বিনষ্টকরণের আগে পর্যন্ত পচনশীল ও অপচনশীল আবর্জনাগুলিকে আলাদা করে রাখতে পারি, তাহলে আমাদের-
- আশেপাশের পরিবেশ দূষিত হবে না।
- ময়লা ফেলে দেওয়ার পরে কোন মানুষকে সেগুলি হাত দিয়ে বাছাই করতে হবে না।
- রোগের জীবাণু সংক্রমিত হবে না।
- যে জাতীয় আবর্জনা যে ধরণের কাজে লাগে, সেগুলোকে সেই সেই স্থানে পাঠিয়ে দেওয়া সহজ হবে।

আমরা এখনো খাদ্যদ্রব্যের বাজার করতে গিয়ে প্লাস্টিক ব্যাগ ব্যবহার করছি। পরে সেই ব্যাগ ডাস্টবিনে ফেলে দিচ্ছি, বা তাতে করে ঘরের আবর্জনা ভরে বাইরে ফেলছি। দেশের শহর ও গ্রামে এখনো ময়লা সংগ্রহ, স্তুপকরণ, প্রক্রিয়াকরণ বা পুনর্ব্যবহারকরণের টেকসই কোন ব্যবস্থা না থাকাতে নালা-নর্দমা, খাল-বিল, পুকুর-নদী, মাঠ-ময়দান, রাস্তা-ফুটপাত, আবাদী বা আবাসিক জমি, সবখানে এখন আবর্জনা বিশেষত অপচনশীল আবর্জনা মহামারির মত জেঁকে বসেছে।
জানালা দিয়ে পাশের খালে দেখুন। খালে থাকার কথা ময়লা "পানি", পানির কোন প্রবাহ আছে? খালগুলি যেন ময়লার এক বিশাল ভান্ডার, যার কোন শেষ নেই। কেন আমাদের ঘরে-বাড়িতে মশা-মাছির উৎপাত হবে না? পুকুরে-জলাশয়ে এসব প্লাস্টিকজাতীয় ময়লার কারণে মাছ ও জলজ প্রাণী বেঁচে থাকতে পারছে না; ব্যবহারের অযোগ্য হয়ে পরেছে এসব জলাধারের পানি।
রাস্তায় হাঁটতে গিয়ে দেখবেন কিছুক্ষণ পর পরেই এধারে-ওধারে, পথের উপরে, ফুটপাতের মাঝে মাঝে অঘোষিত ডাস্টবিন। নালাগুলিতে আমাদের ঘরবাড়ি থেকে ব্যবহৃত পানি প্রবাহিত হওয়ার কথা; অপচনশীল আবর্জনায় সারা বছর উপচে থাকছে নর্দমাগুলি। বর্ষাকালে হচ্ছে জলাবদ্ধতা।
আবাদী জমিতে এসবের কারণে ভালো ফলন হচ্ছে না। মাটি উর্বরতা হারাচ্ছে। খাদ্যচক্রের রন্ধ্রে রন্ধ্রে এখন প্লাস্টিকের অণু-পরমাণু ঘটিত অস্বাভাবিকতা।
বসতবাড়ী নির্মাণের জমিতে প্লাস্টিক ও অন্যান্য আবর্জনার উপস্থিতির কারণে নির্মিত ভবনের ভিত্তি হচ্ছে দূর্বল; মাটির স্তরের শক্তি কমে যাচ্ছে, ফলে সহজেই ভবনগুলি হুমকির সম্মুখীন হচ্ছে।

আমাদের আশেপাশের সমস্যাগুলি বহুমুখী। এত ধরণের এত সমস্যা দেখে হয়তো মনে হবে এসবের সমাধান আমাদের পক্ষে সম্ভব না, অথবা, হয়তো এসবের দায়িত্ব "আমার" না। কিন্তু, সমস্যাগুলির সমাধান কিন্তু কেন্দ্রীভুত, একীভূত, পারস্পরিক সম্পর্কযুক্ত।
আপনার একটি কথা বা কাজই কিন্তু সমাজের এসব সমস্যা সমাধানে ভূমিকা রাখতে পারে। সবকিছু সরকার, রাষ্ট্র, প্রশাসন বা কতৃপক্ষের উপর ছেড়ে দিয়ে বসে থাকলে কিন্তু শেষে ভুক্তভোগী হতে হবে আমাদের নিজেদেরই।

সবার শেষে আপনাদের সাথে আরো একটা ভিডিও লিঙ্ক শেয়ার করতে চাই, যেখানে দেখানো হয়েছে, মানুষের সদিচ্ছা, আন্তরিকতা, সচেতনতা, আর পারস্পরিক সহযোগিতা কিভাবে একটি সামান্য গ্রামকে পৃথিবীর বুকে "আদর্শ" হিসেবে তুলে ধরতে পারে!

https://www.youtube.com/watch?v=4kE5cHv-KFE

লিখেছেন- এঞ্জিনিয়ার আবীর চৌধুরী, টেকনিক্যাল এডিটর, আলোর কন্ঠ

সর্বশেষ সংবাদ