মহিয়সী নারী কবি বেগম সুফিয়া কামালের ১০৪তম জন্মদিন।

পোস্ট করা হয়েছে 20/06/2015-04:09pm:   
বিশেষ প্রতিবেদনঃ আজ (শনিবার) ২০ জুন। নারী আন্দোলনের অন্যতম অগ্রদূত এই মহিয়সী নারী কবি সুফিয়া কামালের ১০৪তম জন্মদিন। একাধারে কবি, লেখিকা, শিক্ষিকা ও নারী অধিকার আন্দোলনের অন্যতম অগ্রদূত সুফিয়া কামাল ১৯১১ সালের এ দিনে বরিশালের শায়েস্তাবাদে জন্মগ্রহণ করেন। তার বাবা সৈয়দ আবদুল বারী ও মা সৈয়দা সাবেরা খাতুন।
১৯১১ সালের ২০ জুন বরিশালের শায়েস্তাবাদে এক সম্ভ্রান্ত মুসলিম পরিবারে জন্মগ্রহণ করেন তিনি। রক্ষণশীল পরিবারে জন্মগ্রহণ করলেও তিনি স্বশিক্ষায় শিক্ষিত হয়ে ওঠেন এবং ছোটবেলা থেকেই তিনি লেখালেখি শুরু করেন। ১৯১৮ সালে তিনি মায়ের সঙ্গে কলকাতায় যান, সেখানে বেগম রোকেয়ার সঙ্গে তার দেখা হয়। সাহিত্যচর্চার পাশাপাশি দীর্ঘ কর্মজীবনে তিনি মহান মুক্তিযুদ্ধ, স্বৈরাচারবিরোধী গণআন্দোলন, নারী মুক্তির আন্দোলনসহ বিভিন্ন আন্দোলন-সংগ্রামে সক্রিয় সাহসী ভূমিকা রেখেছেন।
সাহিত্য চর্চার পাশাপাশি নারীমুক্তি, মানবমুক্তি এবং গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠায় নিরলস কাজ করে গেছেন এই নারী। তিনি বাহান্নর ভাষা আন্দোলনে সক্রিয় ভূমিকা রেখেছেন। ১৯৬১ সালে পাকিস্তান সরকার কর্তৃক রবীন্দ্রসঙ্গীত নিষিদ্ধের প্রতিবাদে সংঘটিত আন্দোলনেও যোগ দেন তিনি। ’৬৯-এর গণঅভ্যুত্থানে অংশ নিয়েছেন। একাত্তরের মার্চে অসহযোগ আন্দোলনে নেতৃত্ব দিয়েছেন। তিনি যেন একটি নাম। একটি ইতিহাস। প্রথিতযশা কবি, লেখিকা এবং নারী আন্দোলনের অন্যতম পথিকৃৎ। তিনি ছিলেন মানবতা ও গণতান্ত্রিক মূল্যবোধের পক্ষে এক আপসহীন নারী। তার কণ্ঠ অন্যায়, দুর্নীতি এবং অমানবিকতার বিরুদ্ধে ছিল সদা সোচ্চার। মৃত্যুর আগ পর্যন্ত তিনি রাজনীতিক, সাহিত্যিক ও সংস্কৃতি কর্মীদের অনুপ্রেরণা জুগিয়েছেন।
সাহিত্যচর্চার পাশাপাশি পাশাপাশি সুফিয়া কামাল লিখতেও শুরু করেন। ১৯২৩ সালে ‘তরুণ’ পত্রিকার প্রথম বর্ষের তৃতীয় সংখ্যায় তার প্রথম লেখা “সৈনিক বধূ” প্রকাশিত হয়। এসময় মিসেস এস.এন. হোসেন ছদ্মনামে তার লেখা ছাপা হয়। এরপর ১৯২৬ সালে তার প্রথম কবিতা ‘বাসন্তী’ সেসময়ের জনপ্রিয় পত্রিকা ‘সওগাতে’ প্রকাশিত হয়।
সুফিয়া কামালের নারী অধিকার আদায় ও সচেতনতার চিন্তাধারার উন্মেষ ঘটে ‘আঞ্জুমানে খাওয়াতিনে ইসলাম’ সংগঠনের মাধ্যমে। এ সংগঠনেই বেগম রোকেয়ার সঙ্গে তার পরিচয় হয়। নারী সমাজের সচেতনতা বৃদ্ধির কাজে নামেন তিনি। সঙ্গে এগিয়ে চলে তার সংগ্রামী কলম।
১৯৩৮ সালে প্রথম কাব্যগ্রন্থ সাঁঝের মায়া লিখে রবীন্দ্রনাথসহ আরও বিশিষ্টজনের প্রশংসা অর্জন করেন সুফিয়া কামাল।
সুফিয়া কামাল শুধ‍ু সাহিত্যই নয় সামাজিক কর্মকাণ্ডের সঙ্গেও যুক্ত ছিলেন। ভাষা আন্দোলন, গণঅভ্যুত্থান, অসহযোগ আন্দোলন, নারীজাগরণ আর সমঅধিকার প্রতিষ্ঠার সংগ্রাম ও ১৯৯০ সালে স্বৈরাচার বিরোধী আন্দোলনে সক্রিয়ভাবে অংশ নেন তিনি।
১৯২৬ সালে সওগাত পত্রিকায় প্রথম কবিতা ‘বাসন্তী’ প্রকাশের মধ্যে দিয়ে কবি সুফিয়া কামালের কাব্য প্রতিভার প্রকাশ ঘটে। তার রচিত সাহিত্যের মধ্যে সাঁঝের মায়া, কেয়ার কাঁটা, মায়া কাজল, একাত্তরের ডায়েরি, উদাত্ত পৃথিবী, একালে আমাদের কাল উল্লেখযোগ্য। এ ছাড়া অজস্র কবিতা, গল্প ও ভ্রমণ কাহিনী রয়েছে। সাহিত্য সৃষ্টি, বৈষম্যহীন সমাজ বিনির্মাণ ও রাজনৈতিক কর্মকাণ্ডের স্বীকৃতিস্বরূপ তিনি একুশে পদক, স্বাধীনতা দিবস পদক ও বাংলা একাডেমি পুরস্কারসহ প্রায় ৫০টির ও বেশি পুরস্কার লাভ করেন।
বাংলাদেশে নারীজাগরণ ও অসাম্প্রদায়িক নারী-পুরুষ সমঅধিকার প্রতিষ্ঠার সংগ্রামে আমৃত্যু লড়ে গেছেন প্রগতিশীল আলোকিত এই নারী। এদেশে নারী অগ্রাসনে তার ভূমিকা অসামান্য।
১৯৯৯ সালের ২০ নভেম্বর ঢাকায় শ্রদ্ধেয় এই গুণী লেখিকা মৃত্যুবরণ করেন। তাঁকে পূর্ণ রাষ্ট্রীয় মর্যাদায় সমাহিত করা হয়। বাংলাদেশী নারীদের মধ্যে সুফিয়া কামালই প্রথম এই সম্মান অর্জন করেন।
একজন রক্ষণশীল পরিবারের মেয়ে হয়েও শৃঙ্খল ভেঙেছেন তিনি। নারীদের এনেছেন মুক্ত আলোর সন্ধানে। তিনি বলেছেন : ‘তোমার আকাশে দাও মোর মুক্ত বিচরণ-ভূমি/ শিখাও আমারে গান/ গাহিব, শুনিবে শুধু তুমি/ মুক্তপক্ষ-বিহগী তোমার বক্ষেতে বাঁধি নীড় যাপিবে সকল ক্ষণ স্থির হয়ে, চঞ্চল অধীর।’ তার জন্মোৎসব উপলক্ষে বিভিন্ন সংগঠন নানা কর্মসূচির আয়োজন করেছে।

সর্বশেষ সংবাদ